kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

এরশাদবিহীন জাপার এক বছর

পার্টি ভাঙেনি, তবে সম্পদ নিয়ে আছে টানাটানি

লায়েকুজ্জামান   

১৩ জুলাই, ২০২০ ০২:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পার্টি ভাঙেনি, তবে সম্পদ নিয়ে আছে টানাটানি

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনা শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হচ্ছে কাল ১৪ জুলাই। এরশাদবিহীন এই এক বছরে জাতীয় পার্টির সবচেয়ে বড় অর্জন সংগঠনটি ব্রাকেটবন্দি হয়নি অর্থাৎ পার্টি ভাঙেনি। তবে এখনো জাতীয় পার্টি অনেক অগোছালো। পার্টির অভ্যন্তরে অনেক পরস্পরবিরোধী সুপ্তধারা বিদ্যমান। এইচ এম এরশাদের রেখে যাওয়া সম্পদ নিয়ে রশি টানাটানি রয়েছে উত্তরসূরিদের মধ্যে।

জাতীয় পার্টি ও এরশাদের উত্তরসূরিদের একাংশ একযোগে এরশাদের মৃত্যু দিবস পালন করতে পারছে না। পৃথক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি একক কর্মসূচি নিলেও এরশাদ ট্রাস্টে এবং রওশন এরশাদের বাড়িতে পৃথক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ট্রাস্ট ও রওশনের ওই সব কর্মসূচিতে জি এম কাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। যদিও এরশাদ ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাজী মো. মামুনুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি সবাইকে দাওয়াত করেছেন। এদিকে ট্রাস্টের অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাও। ট্রাস্টের দাওয়াতপত্রেও কারো নাম নেই।

পার্টির বনানী ও কাকরাইলের কার্যালয়ে এরশাদের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানোসহ রংপুরে এরশাদের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন পার্টির নেতারা। অন্যদিকে এরশাদ ট্রাস্ট তিন দিনের কর্মসূচি নিয়েছে। এরশাদের মৃত্যুদিবসে মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে রওশন এরশাদের বনানীর বাসভবনে। ওই অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হয়েছে রওশন অনুসারী বলে পরিচিতদের।

একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৪ জুলাই রংপুরে এরশাদের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য যাওয়ার বিষয়ে এরশাদের ছেলে সাদ এরশাদ গত ১১ জুলাই দুপুরে বিদিশা সিদ্দিককে ফোন করেছিলেন পরামর্শের জন্য। সূত্রটি জানায়, সাদকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, ১৪ জুলাই জি এম কাদের যাবেন বলে তাঁদের কর্মসূচি এক দিন পিছিয়ে দিতে এবং এটাও বলা হয়েছে, ‘আমি বিদিশা তোমার সঙ্গে রয়েছি।’

পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদিও মনে করছেন জাতীয় পার্টি সঠিক অবস্থানে রয়েছে এবং জনপ্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে পার্টিতে ভিন্ন কথাবার্তাও আছে। এরশাদের মৃত্যুর পর পার্টির প্রথম কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর। ওই সম্মেলনে পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের উদ্যোগে দলীয় গঠনতন্ত্রের ধারা সংশোধন করে রওশন এরশাদের জন্য প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ সৃষ্টি করে দলের ভাঙন ঠেকানো হয়। তবে গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা হ্রাস করার দাবি উঠলেও তা করা হয়নি। এরশাদের সময়ের মতোই পার্টিতে যেকোনো পদের নিয়োগ ও বহিষ্কারের এখতিয়ার এককভাবে চেয়ারম্যানের হাতে প্রদত্ত। এটা দলীয় গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলেই জাপার অনেক নেতা মনে করেন।

এরশাদের জীবদ্দশায় জাতীয় পার্টি কয়েক খণ্ডে বিভক্ত হলেও এরশাদ-উত্তর যুগে জি এম কাদের জাপার চেয়ারম্যান হওয়ার পর পার্টি ব্রাকেটবন্দি হয়নি, বরং একসময় জাতীয় পার্টি থেকে কাজী জাফরের সঙ্গে চলে যাওয়া বেশ কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য দলে ফিরে এসেছেন। বিএনপিরও কয়েকজন নেতা জাপায় যোগ দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কথা বলেন, কর্মসূচিতে হাজির থাকেন। বন্যা, করোনাসহ জাতীয় দুর্যোগেও তাঁকে তত্পর দেখা যায়। তবে এরশাদের মৃত্যুর পর পার্টির কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে দলে যে নব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দেশব্যাপী জাপার ৭৫টি সাংগঠনিক কমিটির মধ্যে ৫১টিরই মেয়াদ শেষ। ঢাকাসহ মহানগরগুলোতে পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে না। জাপার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হয়ে উঠেছে মাথা ভারী প্রশাসনের মতো। সবাই কেন্দ্রীয় পদ পেতে আগ্রহী। দলে কর্মীর চেয়ে নেতা বেশি। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়েও পার্টিতে ক্ষোভ রয়েছে। আবার একটি গ্রুপ নানাভাবে জি এম কাদেরকে বিতর্কিত ও পিছু টেনে ধরার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

জাতীয় পার্টির রাজনীতির সমস্যার পাশাপাশি প্রয়াত এরশাদের রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়ে এরশাদের উত্তরসূরিদের একটি অংশ জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে তত্পর রয়েছে।

এরশাদবিহীন জাপার এক বছরে কেমন আছে জাতীয় পার্টি—এই প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান জি এম কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই আমাদের আদর্শ। তাঁর নীতি ও রেখে যাওয়া পথে জনপ্রত্যাশা পূরণে জাতীয় পার্টি এগিয়ে যাচ্ছে। পার্টি সঠিক পথেই আছে বলে মনে করি।’

পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরশাদের শূন্যতা তো পূরণ হওয়ার নয়। তবে তিনি একটি সংগঠন, নীতি ও আদর্শ তাঁর অনুসারীদের জন্য রেখে গেছেন। সেই নীতি-আদর্শ ধারণ করেই তাঁর ভাই জি এম কাদের পার্টিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিচ্ছেন। এরশাদ কারাগারে যাওয়ার পর চাকরি ছেড়ে জি এম কাদের জাতীয় পার্টিতে এসেছেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন সৎ, নির্লোভ মানুষ। মনে রাখতে হবে, জাতীয় পার্টি এখন সংসদে বিরোধী দল।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা