kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

প্রবাসে টিকে থাকার যুদ্ধ দেশে ঘোর অনিশ্চয়তা

করোনা দুর্যোগে বিদেশের শ্রমবাজার

হায়দার আলী    

১৩ জুলাই, ২০২০ ০২:২১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রবাসে টিকে থাকার যুদ্ধ দেশে ঘোর অনিশ্চয়তা

করোনাভাইরাস সংক্রমণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময় বছরে আট থেকে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয় বিদেশের মাটিতে। সেখানে গত চার মাসে কোনো দেশেই নতুন করে কর্মী যেতে পারেননি। উল্টো দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন দুই লক্ষাধিক শ্রমজীবী। এখনো থেকে যাওয়া শ্রমিকরা প্রতিটি ক্ষণ কাটাচ্ছেন টিকে থাকার দুশ্চিন্তা নিয়ে। আবার ফিরে আসা মানুষগুলোও আগামী দিনগুলো নিয়ে আছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। এর পরই রয়েছে কুয়েত, কাতার, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ থেকে এরই মধ্যে ফেরত এসেছেন দুই লক্ষাধিক শ্রমিক। আর প্রবাসে করোনা দুর্যোগে বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ শ্রমিক। তার পরও খেয়ে না খেয়ে টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছেন তাঁরা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্যানুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ প্রবাসী দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন। আর ২১ মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এ পর্যন্ত বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন আরো অন্তত ১৮ হাজার শ্রমিক। তাঁরা পুনরায় ফেরত যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বায়রার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ৭৫ হাজার কর্মীর ভিসা লেগেছিল। তাঁদের মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার কথা ছিল। আর ৮৫ হাজারের বেশি কর্মীর ভিসা প্রক্রিয়াধীন ছিল। কিন্তু করোনার কারণে এই এক লাখ ৬০ হাজার কর্মীর বিদেশে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলে বিভিন্ন দেশ থেকে কর্মহীন হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসার ঢল নামতে পারে। কেননা অর্থনৈতিক ধকল সামাল দিতে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী কর্মীদের চাকরিচ্যুত করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর চাপ বাড়ছে। জানা গেছে, সৌদি আরবে ২০ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ করছেন। এর পরই সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন ১৩ লাখের বেশি শ্রমিক। ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনেও রয়েছেন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি। লেবাননে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক আছেন প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার। তাঁদের ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক এখন কর্মহীন।

প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় যাঁদের সংসার চলত, সেসব স্বজনও চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। বিদেশে বেকার বসে থাকা কর্মীরা স্বজনদের জন্য টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, উল্টো দেশ থেকেই তাঁদের খাওয়া খরচের জন্য এখন স্বজনদের ধারদেনা করে টাকা পাঠাতে হচ্ছে।

জানা গেছে, নরসিংদীর রায়পুরার চরঘিলদী গ্রামের সিরাজউদ্দিন মিয়া দুই বছর আগে ছয় লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যান। করোনার কারণে তিনি এখন বেকার। বাহরাইনে প্রবাসী শ্রমিক আইনুল হোসেন বলেন, ‘এখানে কর্মহীন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার বাংলাদেশি। যে অবস্থা চলছে তাতে না খেয়ে মরা ছাড়া গতি নেই।’

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার আসলাম হোসেন বলেন, ‘দুই মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলাম। এখন ভিসার মেয়াদ শেষ। সৌদিতে আবার যেতে পারব কি না তা নিয়ে খুব টেনশনে আছি।’ ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর গ্রামের রহিমা বেগমের স্বামী সাইফুল ইসলাম ইরাকে চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েছেন। এখন দেশে ফেরার অর্থও নেই তাঁর কাছে।

অভিবাসন বিশ্লেষক ও ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সাড়ে পাঁচ লক্ষাধিক প্রবাসী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সহায়-সম্বল বিক্রি করে বিদেশে যাওয়া এসব কর্মীর সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্ট দেশের এগিয়ে আসা উচিত। আর দেশে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসনে সরকারের কর্মসূচি নেওয়া দরকার।’

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের একটি জরিপে উঠে এসেছে, বিদেশ থেকে ফেরত আসা ৮৭ শতাংশ প্রবাসীর এখন দেশে আয়ের কোনো উত্স নেই। তাদের ৫২ শতাংশই জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা চাইছে। তবে কাজটি সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সবাই মিলে করতে হবে।’

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটিং মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে প্রবাসীরা কর্মহীন অবস্থায় কষ্টে আছেন। শ্রমিকদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ বিষয়ে সরকারের দ্বিপক্ষীয় তত্পরতা বাড়ানো উচিত।’

বায়রা সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, ‘করোনার কারণে আমাদের শ্রমবাজার কঠিন সময় পার করছে। বিদেশে থাকা অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে সমস্যায় আছেন। তবে ছুটিতে আসা কর্মীদের ভিসার মেয়াদ তিন মাস বাড়িয়েছে সৌদি সরকার। অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে কথা চলছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা