kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৭। ৬ আগস্ট  ২০২০। ১৫ জিলহজ ১৪৪১

তেড়েফুঁড়ে ঢুকছে উজানের পানি

ফের বিপজ্জনক হয়ে উঠছে নদ-নদী, বন্যা আরো ভোগাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ জুলাই, ২০২০ ০২:০৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তেড়েফুঁড়ে ঢুকছে উজানের পানি

রোজই পানি বাড়ছে হু হু করে। তলিয়ে যাওয়া এলাকা ছেড়ে মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। রংপুরের গঙ্গাচড়ার চর ইচলী এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘নদীর বান তো আর থামছে না। পানি বাড়ছে তো বাড়ছেই। বানোত এলা ঘর ভাসি যাওয়ার মতোন অবস্থা। খাওয়া বন্ধ শুকুরবার (শুক্রবার) আইত (রাত) থাকি। কষ্ট হামরা দুইটা মানসি (স্বামী-স্ত্রী) সহ্য করির পারিলেও ছাওয়া দুইটা খাওয়ার কষ্ট সহ্য করির পারছে না।’ ছলছল চোখে কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন নীলফামারীর ডিমলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তাপারের পূর্বখড়িবাড়ী গ্রামের পানিবন্দি ইয়াকুব আলী (৪৫)। তিনি জানান, গত শুক্রবার দুপুরের পর বাড়িতে পানি ঢোকায় রাতে আর রান্না করা সম্ভব হয়নি। দুই সন্তানসহ পরিবারের চার সদস্য শনিবার সকালে খেয়েছে প্রতিবেশীর দেওয়া এক মুঠ করে চিঁড়া। ওই খাওয়ায় দুপুর পেরিয়ে বিকেল। রাতের খাবার জুটবে কিভাবে তা-ও অজানা। শুধু ইয়াকুব আলীই নন, একই অবস্থা  দেশের বানভাসি প্রতিটি পরিবারে। লাখ লাখ বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ যেন পিছু ছাড়ছে না। সরকারি ত্রাণও চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় মানুষের মনে চলছে হাহাকার।

ভারি বর্ষণ আর উজানের ঢলে সিলেট ও সুনামগঞ্জে গত বৃহস্পতিবার থেকেই বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি হতে শুরু করে। প্রধান প্রধান সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটছে ওই দুই জেলায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নতুন করে আরো আটটি জেলায় আজ বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের পাশাপাশি আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, নাটোর ও নেত্রকোনার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। তিস্তা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদী সিলেট পয়েন্টে, পুরনো সুরমা নদীর দিরাই পয়েন্টে এবং সোমেশ্বর নদীর দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি সমতল থেকে বাড়তে শুরু করেছে। তবে পদ্মা নদীর পানি এখনো স্থিতিশীল। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বগুড়ায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১০৫ মিলিমিটার এবং নেত্রকোনায় ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১০১টি স্টেশনের মধ্যে ৫৭টিতে পানি বাড়ছে, ৪২টিতে কমছে, আর দুটি স্টেশনের পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে এরই মধ্যে বলা হয়েছে, এবারের বন্যা হবে দীর্ঘমেয়াদি। জুলাই মাসজুড়েই থাকবে বন্যা।

এদিকে ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের চার উপজেলায় ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদ-নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে পানি। ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে পানির নিচে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গতকাল শনিবার বিকেলে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে সিলেট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া সারি নদীর সারিঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। বাকি সব পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও আগের চেয়ে বেড়েছে। 

পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের প্রধান নদী সুরমা, যাদুকাটা ও চলতির পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমার পানি গতকাল বিকেল ৩টায় বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। এদিকে পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণে শহরের নবীনগর, কাজির পয়েন্ট, ষোলঘর, উকিলপাড়া, হাজিপাড়া, বড়পাড়া, সাববাড়ী, তেঘরিয়া, মল্লিকপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি ও দোকানপাট প্লাবিত হয়েছে। এদিকে গতকাল বিকেলে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জয়নুল বারীকে নিয়ে জেলা প্রশাসন জরুরি সভা করেছে। বন্যার খোঁজখবর নিতে প্রশাসন প্রতিটি উপজেলায় তথ্যকেন্দ্র খুলেছে। বন্যাকবলিত দোয়ারাবাজার, ছাতক ও বিশ্বম্ভরপুরের ৫৫০টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। এদিকে নতুন করে পানি বাড়ার ফলে বিভিন্ন এলাকার আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া মৎস্য খামার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভেসে গেছে মাছ।

হবিগঞ্জের হাওর এলাকায় দ্রুতগতিতে পানি বাড়ছে। এর ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যার পানি দ্রুত বেগে হবিগঞ্জের হাওরে ঢুকছে। ফলে বন্যা আতঙ্কে রয়েছে হাওরবাসী।

এদিকে ভারি বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফের ফুলেফেঁপে উঠেছে তিস্তা। গতকাল শনিবার সকালে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি আরো বেড়ে বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটের সব কটি খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তিস্তার কারণে সৃষ্ট বন্যায় নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়ে নদীপারের পরিবারগুলো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছার নদীতীরবর্তী ৫০ গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার পরিবার। বিশেষ করে চরাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

নীলফামারীতে বন্যা পরিস্থিতি অপিরিবর্তিত রয়েছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, গত শুক্রবার নদীর পানি এ বছরের সর্বোচ্চ বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শনিবার দিনে কিছুটা কমলেও সন্ধ্যায় আবারও বেড়ে ৩৩ সেন্টিমিটার ওপরে ওঠে। নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারি বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানি বাড়ছে।

এদিকে গত তিন দিনের প্রবল বর্ষণ ও উজানের ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বেড়েছে। এর মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়িঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার এবং তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে গতকাল সন্ধ্যায় বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

লালমনিরহাটের ধরলা নদীর পানিও বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। গতকাল আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ১২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে রাজবাড়ীতে কয়েক দিন ধরে পদ্মার পানি কমলেও গতকাল ফের বাড়তে শুরু করেছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় পদ্মায় পানি বেড়েছে ৬ সেন্টিমিটার, যা দৌলতদিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে নতুন করে পানি বাড়তে থাকায় পদ্মার নিম্নাঞ্চল ফের প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পানি বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের ফসলি জমি ও বাড়িঘরের আঙিনায় পানি আসতে শুরু করেছে। নদীতে স্রোত থাকায় ভাঙনও দেখা দিয়েছে।

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাড়তে শুরু করেছে উব্দাখালী নদীর পানি। পানি বেড়ে যাওয়ায় ফের কলমাকান্দায় বিশরপাশা, বাউশাম, হরিপুর চকবাজার, আনন্দপুর, বরুয়াকোনা ও বড়খাঁপনে কাঁচা ও পাকা সড়কের ওপর দিয়ে পানি বইছে। এদিকে উব্দাখালী নদীর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল ফের প্লাবিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, কলমাকান্দার উব্দাখালী নদীর ডাকবাংলো পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র স্থানীয় প্রতিনিধিরা।]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা