kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

রিজেন্টের সাহেদের আওয়ামী পরিচয়ও ভুয়া

♦ সাহেদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির বহু অভিযোগ
♦ সাহেদসহ রিজেন্টের ৯ জন অধরা ৭ জন রিমান্ডে
♦ র‌্যাব সিলগালা করার আগেই তালা মেরে পালায় মিরপুরের কর্মীরা

এস এম আজাদ   

৯ জুলাই, ২০২০ ০২:৪৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রিজেন্টের সাহেদের আওয়ামী পরিচয়ও ভুয়া

রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে জালিয়াতির অভিযোগে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের বিষয়ে প্রতারণাসহ নানা তথ্য উঠে আসছে। গত সোমবার থেকে অনেক ভুক্তভোগী ফোন করে এবং সরাসরি র‌্যাবের কাছে তাঁর অপকর্মের অভিযোগ জানিয়েছে।

জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং সুবিধা পাওয়ার জন্য কয়েক বছর ধরেই সাহেদ ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করতেন। এভাবে রিজেন্ট গ্রুপসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে তিনি মো. সাহেদ নামে নিজে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিলেও নেতারা জানিয়েছেন, এ পরিচয়টিও ভুয়া।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, একটি নামসর্বস্ব সংবাদপত্রের মালিক হয়ে সেই পরিচয় কাজে লাগিয়ে সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলেন তিনি। তদবির করে টিভি টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারের পক্ষে কথা বলে আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী সাজার চেষ্টাও করেন।

তদন্তকারীরা বলছেন, বহুরূপী সাহেদ আগে বিভিন্ন নাম-পরিচয়ে যেভাবে জালিয়াতি করেছেন সেভাবেই সুশীল ক্ষমতাধর পরিচয়টিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। র‌্যাবের তদন্তে এবার তাঁর সব কুকীর্তি সামনে চলে এসেছে।

অভিযানের সময় থেকেই গাঢাকা দিয়েছেন সাহেদসহ রিজেন্টের ৯ কর্মকর্তা। গতকাল বুধবার ভোরে মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালের শাখাটিতেও তালা দিয়ে পালিয়ে গেছেন সেখানকার কর্মীরা। বিকেলে সেটি সিলগালা করে দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার মিরপুরের শাখায় কিছু করোনা রোগী থাকায় অভিযানে সিলগালা না করে রোগী স্থানান্তর করতে বলা হয়।

এদিকে গতকাল রিজেন্টের গ্রেপ্তার আট কর্মীর মধ্যে সাতজনকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপকমিটির সাধারণ সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, সাহেদ কমিটির সদস্য নন। কমিটি এখনো অনুমোদন পায়নি। অনুমোদনের জন্য দলের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে যে তালিকা দেওয়া হয়েছে সেখানে সাহেদের নাম নেই।

শাম্মী আহমেদ বলেন, ‘সদস্য হওয়ার একটি প্রক্রিয়া আছে। আপনার অবশ্যই একটি ডকুমেন্ট (চিঠি) থাকতে হবে। তিনি কখনো সদস্য ছিলেন না। তিনি কোনো ডকুমেন্ট (সদস্য পদ বিষয়ে) দেখাতে পারবেন না।’

বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, ডা. শাম্মী কিছু বৈঠকে অন্য অনেকের মতো মো. সাহেদের উপস্থিত থাকার কথাও বলেছেন। তবে এই উপস্থিতির অর্থ এই নয় যে তিনি কমিটির সদস্য।

একটি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক আগের উপকমিটির কয়েক নেতার সঙ্গে সাহেদ ঘনিষ্ঠভাবে মেশার চেষ্টা করেন। তাঁদের মাধ্যমে গিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ছবিও তোলেন। বিএনপির আমলে যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও হাওয়া ভবনসংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

গতকাল র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালাতে গিয়ে আমরা কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে অ্যানাকোন্ডা (বৃহদাকৃতির হিংস্র সাপ) পাই। যখন আমরা অভিযান শুরু করেছি তখন থেকেই তিনি (সাহেদ) গাঢাকা দিয়েছেন। তিনি তাঁর মোবাইলগুলো বন্ধ করে রেখেছেন। প্রথম দিন দেখেছিলাম ফেসবুকে ছিলেন, কিন্তু এখন তিনি সব কিছু থেকেই নিষ্ক্রিয়। আশা করছি দ্রুত তাঁকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হব। তাঁর বিষয়ে অন্যান্য সংস্থাও সতর্ক রয়েছে। আশা করছি তিনি দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হবেন না।’

সারওয়ার বিন কাশেম আরো বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে বিনা মূল্যে করোনা চিকিৎসার চুক্তি স্বাক্ষরের নামে আসলে হঠকারিতা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারা রোগীদের বিপুল পরিমাণ বিল দিতে বাধ্য করেছে। পাঁচজন সদস্যের একটি পরিবার গত ২০ দিনে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা রিজেন্টের কর্মচারী পলাশকে দিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। রিজেন্ট হাসপাতাল ১০ হাজার টেস্ট করেছে। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজার টেস্টের কাগজ আমাদের হাতে রয়েছে। সরকারের কোনো সংস্থা এ ধরনের রিপোর্ট তৈরি করেনি বলে জানতে পেরেছি। রিজেন্টের কম্পিউটার অপারেটর আমাদের বলেছে, চেয়ারম্যান নিজে ব্যক্তিগতভাবে এসব করিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি তিন মাসে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা নিয়েছে। সেসব উৎস এবং কোথায় গেছে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে তাঁর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ে মামলা দায়ের করা হবে।’

সাহেদের ব্যাপারে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘মিথ্যাকে কেন্দ্র করেই তাঁর উত্থান। ভুয়া পরিচয় দিয়ে নানাভাবে প্রতারণা করেছেন মানুষের সঙ্গে। তিনি একটা এমএলএম কম্পানি খুলে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন, যার জন্য জেলও খেটেছেন। আমরা জানতে পেরেছি তাঁর নামে-বেনামে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক লাইসেন্সও নেওয়া হয়নি। উল্লেখ করতে চাই, প্রতিদিন নানা জায়গা থেকে অসংখ্য ফোন রিসিভ করছি, তারা সাহেদের অপকর্ম-অরাজকতার বিষয়ে জানাচ্ছে।’ প্রতারণার ধরন সম্পর্কে র‌্যাবের লে. কর্নেল সারওয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলেই তিনি প্রতারণা করতেন। প্রতারকদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। সাহেদ সব সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছিলেন, আসলে তাঁর কোনো পরিচয় নেই।’

র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, তিনি যখনই যার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তাকে কখনো আর্মির মেজর, কখনো কর্নেল পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বিভিন্ন আইডি কার্ড, বিভিন্ন নামে র‌্যাব পেয়েছে। সেই আইডি কার্ডেও তিনি প্রতারণা করেছেন। সেখানে লিখেছেন ভিন্ন ভিন্ন নাম। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অফিসের নাম করেও প্রতারণা করেছেন।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে প্রতারণার অভিযোগে পুলিশ ও র‌্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। তখন নাম ছিল সাহেদ করিম। ওই মামলার কাগজপত্রে দেখা যায়, খুলনার একটি টেক্সটাইল মিলের জন্য দুই টনের ১০টি ও দেড় টনের ১৫টি এসি সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিল সাহেদ করিমের প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠান থেকে এসব পণ্য কিনেছিলেন তাদের ১৯ লাখ টাকার চেক দিয়েছিলেন রাইজিং শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কম্পানি এবং রাইজিং রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো নামে ফেনীর এক ভুক্তভোগী র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেছেন, সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট কেসিএস পূর্বাচল প্রজেক্টে বালু সরবরাহের কাজ পেয়েছিল তাঁর প্রতিষ্ঠান রুসাফা কনস্ট্রাকশন। সিলেট থেকে বালু সরবরাহের পর সাহেদ তাঁর পাওনা ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৯ টাকা দেননি। উল্টো একদিন অফিসে ডেকে নিয়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে পেটানো হয়। এরপর ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে সই নিয়ে মেরে গুম করে ফেলার হুমকি দেন। গত বছরের ৩১ অক্টোবর এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভুট্টো।

র‌্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বছর তিন-চার আগে সাহেদ নিয়মিত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে ঘোরাঘুরি করতেন। তদবির করে টিভি টক শোতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে নিজের প্রভাব বাড়িয়েছেন। ‘নতুন কাগজ’ নামের একটি পত্রিকার মালিক ও সম্পাদক হয়েছেন। নিজেকে উত্তরা মিডিয়া ক্লাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন।

গতকাল বিকেলে মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালের শাখা সিলগালা করার পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘এখানে ২২ জন রোগী থাকায় মঙ্গলবার সিলগালা না করে রোগী স্থানান্তরের কথা বলে আমরা চলে যাই। রাতের মধ্যেই রোগী সরিয়ে তারা তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গেছে। রিজেন্টের মিরপুর শাখাটিও করোনা রোগীর চিকিৎসায় প্রতারণা করেছে। ২০১৮ সালে মিরপুরের এই হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে আট লাখ টাকা জরিমানা করে সতর্ক করে দিয়েছিলাম।’

সাত আসামির রিমান্ড : উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন, করোনা টেস্ট না করে রোগীদের জাল রিপোর্ট দেওয়া, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের ১৭ জনের বিরুদ্ধে র‌্যাব মামলা করেছে। র‌্যাবের হাতে আটক আটজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আলমগীর গাজী। মহানগর হাকিম হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব (১), হেলথ টেকনিশিয়ান আহসান হাবীব (২), হেলথ টেকনোলজিস্ট হাতিম আলী, রিজেন্ট গ্রুপের প্রকল্প প্রশাসক রকিবুল ইসলাম, মানবসম্পদ কর্মকর্তা অমিত বণিক, গাড়িচালক আবদুস সালাম ও হাসপাতালের কর্মী আবদুর রশিদ খান জুয়েলের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। হাসপাতালের অভ্যর্থনাকারী কামরুল ইসলামের বয়স কম হওয়ায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তাকে গাজীপুরের শিশু (কিশোর/কিশোরী) উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা