kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

করোনাকালের দিনলিপি
মোফাজ্জল করিম

এমন সর্বগ্রাসী বিপর্যয় দেখিনি

বাহরাম খান    

৯ জুলাই, ২০২০ ০২:১৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এমন সর্বগ্রাসী বিপর্যয় দেখিনি

‘গত ১০ বছরে যত বই পড়া হয়নি, গত দেড় মাসে তার চেয়েও বেশি বই পড়া হয়ে গেছে। এদিক থেকে খুব তৃপ্তি লাগছে। বই পড়ার মাঝে অন্য রকম আনন্দ আছে। এই আনন্দ নিজে নিজেই অনুভব করা যায়’—কথাগুলো বলছিলেন সাবেক সচিব ও কবি মোফাজ্জল করিম। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ঢাকাতেই স্থায়ী হয়েছেন তিনি। কিন্তু দেড় মাস ধরে আছেন সিলেটে, মেয়ের বাসায়। সেখান থেকে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে টেলিফোনে করোনাকালের জীবনযাপন নিয়ে বললেন নানা কথা।

এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা মোফাজ্জল করিম। ছেলে তিন দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। মেয়ে থাকেন সিলেটে। মেয়ে ও জামাই দুজনেই সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক। মাস দেড়েক আগে মেয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে করোনার কারণে আটকা পড়েছেন। মোফাজ্জল করিম সেখান থেকে নতুনভাবে জীবন অনুভব করছেন, পড়ছেন, লিখছেন আর মোবাইলে যোগাযোগ করছেন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের সঙ্গে।

১৯৪১ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জন্ম নেওয়া মোফাজ্জল করিম এক জীবনে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাগরিক। আগামী ৬ আগস্ট পা দেবেন ৭৯ বছরে। করোনাকালের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বললেন, ‘এই জীবনে বন্যা, খরা, যুদ্ধ, অভাব, দুর্ভিক্ষ—কত কিছুই তো দেখেছি। কিন্তু করোনার মতো এত সর্বগ্রাসী বিশ্ববিপর্যয় দেখিনি। এমন অবস্থার কথা কখনো কল্পনাও করা যায়নি। পুরো পৃথিবী একসময়ে একটি মাত্র বিষয়ে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে।’

দৈনন্দিন জীবনযাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়ে ও জামাই দুজনেই ডাক্তার হওয়ায় আমার প্রতি তাঁদের সতর্কতা সবচেয়ে বেশি। এ কারণে চাইলেও ঢাকায় যেতে পারছি না। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি। বাসার বাইরে একেবারেই যাচ্ছি না, গৃহবন্দি অবস্থা বলতে যা বোঝায় আর কি।’

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে মোফাজ্জল করিম বলেন, ‘করোনাকালে নিয়ম-কানুন মানার বিষয়ে বেশির ভাগ মানুষই উদাসীন। জাতি হিসেবে আমরা যে বিশৃঙ্খল তা আবারও প্রমাণ করছি। মানুষ অকারণেও বাসা থেকে বের হয়ে আড্ডা দেয়, ঘোরে—এগুলো দেখলে কষ্ট লাগে। এই সময়টার ভয়াবহতা আমরা বুঝতে পারছি না। আমি বাসায় থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এমন অনেকে আছেন যাঁদের সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ ছিলই না, কারো খোঁজ নেওয়ার সময় হতো না, এখন তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছে। এটা একটা ভালো দিক।’ তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে করোনার ছোবলে অনেকে আর্থিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের কাছের মানুষদের মধ্যে যাঁরা এমন অবস্থায় আছেন তাঁদের সহযোগিতা করাও সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব।’

ঢাকায় থাকা ভাই-বোনদের সবচেয়ে বেশি মিস করছেন উল্লেখ করে মোফাজ্জল করিম বলেন, ‘আমাদের বাড়ি মৌলভীবাজারে হলেও প্রায় সবাই ঢাকায় থাকি। সিলেটে আটকে পড়ায় তাঁদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে না। এ জন্য মন খারাপ লাগে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হলে প্রথমেই ভাই-বোনদের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘করোনাকাল শেষ হলে দেশের সামগ্রিক ঐক্যের চিত্র দেখতে পারলে আনন্দ পাব। এমন একটি বিপর্যয়ের সময়েও আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে ব্লেম গেম খেলে যাচ্ছি। এই সময়টাও যদি আমাদের নতুন কিছু ভাবতে বা করতে না শেখায় তাহলে হতাশ হব। বিশেষ করে এই সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির যে চিত্র আসছে তা খুবই লজ্জার। এসব জায়গা থেকে বের হয়ে আসার জন্য জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে নিজেদের শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের সব ক্ষেত্রে নৈতিকতার জায়গায় বড় অগ্রগতি ঘটাতে পারি।’

মোফাজ্জল করিম বলেন, ‘হতাশার মাঝেও বড় আশার কথা হচ্ছে ডাক্তার, নার্স, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশ সদস্যরা সম্মুখযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। এই চিত্র আমাকে খুব আশাবাদী করে। করোনাযুদ্ধে যুক্তদের মধ্যে সরকার শুধু সরকারি চাকুরেদের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে। সব সম্মুখযোদ্ধার জন্য এটা বিবেচনা করা উচিত। সেই সঙ্গে মহামারি শেষে তাঁদের জাতীয়ভাবে সংবর্ধিত করা উচিত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা