kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

ভাসমান হোটেলে ৮০ টাকায়ও থাকার লোক নেই!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ জুলাই, ২০২০ ০৮:০৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাসমান হোটেলে ৮০ টাকায়ও থাকার লোক নেই!

ওয়াইজঘাটের বুড়িগঙ্গা তীরের এসব ভাসমান হোটেলে আশপাশের শ্রমজীবী মানুষ কম খরচে রাত যাপন করতেন। করোনার এ সময়ে সেগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানী শহরে এক রাত থাকার খরচ মাত্র ৮০ টাকা! প্রতিটি কক্ষেই রয়েছে একটি খাট, বালিশ, কাঁথা ও ফ্যান। দেখতে ছোট হলেও রয়েছে আয়েশ করে শোয়ার সুব্যবস্থা। পুরান ঢাকার সদরঘাট-সংলগ্ন আহসান মঞ্জিলের ঠিক বিপরীত পাশে ওয়াইজঘাটের পাঁচটি ভাসমান হোটেলকে অনেকেই ‘গরিবের ফাইভ স্টার হোটেল’ বলে থাকে। ঢাকায় এর চেয়ে সস্তার আবাসিক হোটেল আর নেই। এত কম খরচে শহর ঢাকায় রাতে থাকা যায় শুনে অবাক হতে পারেন। এই হোটেলের একক কেবিনের ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকা মাত্র। দ্বৈত কেবিনের জন্য গুনতে হবে একটু বেশি—১২০ থেকে ১৩০ টাকা। তবে করোনার আগে ভাসমান হোটেলগুলোতে সিট পাওয়া নিয়ে হৈচৈ হলেও এখন নিয়মিতই ফাঁকা থাকছে অর্ধেকের বেশি রুম। মাত্র ৮০ টাকায়ও থাকার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। কাস্টমারের অপেক্ষায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকেন মালিক-ম্যানেজাররা। সদরঘাটসহ বুড়িগঙ্গার পার ঘেঁষে বসা হকারদের জীবন এখন গতিহীন। করোনা আতঙ্কের আবহে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার পর তাদের অনেকেই আর ফেরেনি রাজধানীতে।

ভাসমান হোটেল সংশ্লিষ্টরা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র পুরান ঢাকায় স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা এখন অনেক কম। পুরান ঢাকায় দেশের বৃহত্তম পাইকারি কাপড়ের বাজার ইসলামপুরে; ফলের আড়ত বাদামতলীতে; কাঁচা ও নিত্যপণ্যের আড়ত শ্যামবাজার, ফরাশগঞ্জ ও রহমতগঞ্জে। কসমেটিকস, খেলনা, প্লাস্টিক সামগ্রী ও ঘর সাজানোর উপকরণের পাইকারি মোকাম চকবাজার ও মৌলভীবাজারে। ব্যবসা-বাণিজ্যের এই কেন্দ্রগুলোতে লাখ লাখ ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক কাজ করেন। যাঁদের স্থায়ীভাবে বাসা বা মেসে থাকার সামর্থ্য নেই। এই ভ্যানচালক, দিনমজুর ও ফুটপাতের অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা সারা দিন কাজ করে রাতে কম টাকায় থাকতে ভাসমান হোটেলে আসতেন। এখন এই শ্রমিকদের অনেকেই কাজ হারিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। ফলে এখন ভাসমান হোটেলগুলো আরো ফাঁকা।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকার বুড়িগঙ্গায় পাঁচটি ভাসমান হোটেল যেন মুখ ব্যাদান করে রয়েছে। ফরিদপুর মুসলিম বোর্ডিং, শরীয়তপুর মুসলিম বোর্ডিং, উমা উজালা, বুড়িগঙ্গা ও নাজমা নামের ভাসমান হোটেলগুলো ছিল প্রায় বোর্ডারশূন্য। মাঝে মধ্যে নদীর পার থেকে দুই-একজন কাস্টমার হাঁক ছেড়ে জিজ্ঞেস করে, বিছানায় ছারপোকার দৌরাত্ম্য আছে কি না, ভাড়া কত ইত্যাদি। পরে তারাও চলে যাচ্ছে। বুড়িগঙ্গা হোটেলের ম্যানেজার রতন চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এইখানে ৪০টা সিট আছে। একজন থাকলে ৮০ টাকা আর দুইজন একলগে থাকলে ১০০ টাকা। আগে হকার, আর ছোডখাডো ব্যবসায়ীগোর লাইগা ঝামেলায় পড়তে হইতো। এই কইতো আমি থাকমু, ওই কইতো আমি থাকমু। সিট নিয়া কাড়াকাড়ি চলতো। আর এহন মোডে ২০টাও পুরে না (বুকিং হয় না)। মালিকের ইনকাম নাই। বেতনও ঠিকমতো পাই না। কাস্টমার না থাকলেও হাজার খানিক টেহা খরচা লাগে।’

আর ফরিদপুর মুসলিম বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘আমাগো ব্যবসা হইলো সদরঘাটের ব্যবসানির্ভর। এইহানে লঞ্চ চললে সব চলে, না হয় সব বন্ধ। ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জায়গার মানুষ মাল কিনতে আইয়া থাইকা যাইতো। এহন কাপড়, ফল, খেলনা কিনবে কে? করোনার আগে ভালাই আছিলাম, এখন প্রত্যেক দিনই লস। ৫০ সিটের অর্ধেকই খালি থাহে।’

জানা যায়, সত্তর দশকে ভাসমান হোটেলগুলো বেশ জমজমাট ছিল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হিন্দু ব্যবসায়ীদের অনেকে রাতে থাকার জন্য বেছে নিতেন ভাসমান এই আবাস। অনেকেই রাজধানীর মুসলিম হোটেলগুলোতে খেতেন না, রাত্রি যাপনও করতেন না। তাঁদের চাহিদাকে সামনে রেখে কিছুসংখ্যক হিন্দু ব্যবসায়ী কাঠের তৈরি পুরনো নৌযানকে কাজে লাগিয়ে এসব ভাসমান হোটেল তৈরি করেন। স্বাধীনতার পরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ব্যাপক চাহিদা থাকায় মুসলমান ব্যবসায়ীরাও এই ব্যবসায় নামেন। বাড়তে থাকে মুসলমান বোর্ডারও। ফলে বুড়িগঙ্গা পারের ওয়াইজঘাটে ভাসমান হোটেল ব্যবসাটা জমজমাট রূপ নেয়।

এদিকে করোনার কারণে বর্তমানে কাস্টমার কম হলেও পুরনো কিছু কাস্টমার এখনো থাকছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যাবসায়িক কাজে ঢাকা এলে নিয়মিত ভাসমান হোটেলে থাকেন ব্যবসায়ী শরীফুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফল কেনতে আইছেলাম। দুই ঝুড়ি আম কিন্না রাইতের লঞ্চে পাঠাইয়াও দেছি। আইজকা আরো কেনমু, হেরপর রাইতের লঞ্চে কইরা বরিশাল চইল্লা যামু।’ শরিফুল জানালেন, ঝালকাঠিতে তাঁর ফলের দোকান আছে যা পরিচালনা করে ছেলে। তিনি ঢাকায় ফল কিনতে এলে এই ভাসমান হোটেলগুলোতেই থাকেন। তবে ভাসমান হোটেলের দিনকাল এখন ভালো যাচ্ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা