kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭। ৭ আগস্ট  ২০২০। ১৬ জিলহজ ১৪৪১

ঘাম ছুটছে অন্য সবার, হাত গুটিয়ে বাংলাদেশ

করোনা সংকটকালে এসংক্রান্ত কোনো তথ্য দেয়নি বিবিএস

আরিফুর রহমান   

৬ জুলাই, ২০২০ ০২:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘাম ছুটছে অন্য সবার, হাত গুটিয়ে বাংলাদেশ

আফ্রিকার দেশ উগান্ডার পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে তাদের দেশে নির্মাণ খাতের মজুরি ও উপকরণের দামের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে তা নিয়ে তাৎক্ষণিক একটি জরিপ করে গত এপ্রিলে। তাতে দেখা গেছে, অর্থবছরের শেষ মাস মার্চে নির্মাণ খাতের উপকরণ মূল্য ও মজুরি আগের মাসের তুলনায় ০.৮৮ শতাংশ কমে গেছে। সোয়া চার কোটি মানুষের দেশটিতে কত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, কতজন সুস্থ হয়ে উঠেছে—এসব তথ্য সরকারকে সরবরাহ করে আসছে দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো। এ ছাড়া জুন পর্যন্ত তাদের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে, মূল্যস্ফীতির হার কত হয়েছে—এসব তথ্যও সরকারকে সরবরাহ করেছে তারা। এবার তাকানো যাক আফ্রিকার আরেক দেশ নাইজেরিয়ার দিকে। করোনার প্রভাবে কতসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছে তা নিয়ে তাৎক্ষণিক জরিপ করে দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস)। তাদের জরিপে ৪২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছে কভিড-১৯-এর কারণে তারা চাকরি হারিয়েছে। ৭৯ শতাংশ পরিবার বলেছে, তাদের আয় কমে গেছে।  করোনার কারণে কোন কোন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে, সেটিও জরিপে তুলে এনেছে এনবিএস। কানাডার পরিসংখ্যান ব্যুরো গত ২৯ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত চার হাজার ৬০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখতে চেয়েছে, করোনার কারণে মানুষের সময় কিভাবে কাটছে। তাতে দেখা যায়, ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। মদ বিক্রির হারও বেড়েছে বলে জানিয়েছে ১৪ শতাংশ পরিবার। করোনা পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইউরোপের অন্তত ২০টি দেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিটি দেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো চলমান মহামারির মধ্যেও নিজেদের সর্বোচ্চটুকু সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।

এবার ফেরা যাক করোনাকালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কর্মকাণ্ডের দিকে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। আর করোনায় প্রথম প্রাণহানি হয় ১৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে টানা দুই মাসেরও বেশি সময় চলে সাধারণ ছুটি। সাধারণ ছুটি বাতিল করে ৩১ মে থেকে সরকারি অফিস-আদালতসহ সব কিছু খুলে দেয় সরকার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার চার মাসে সরকারি সংস্থা বিবিএস থেকে সরকারের কাছে করোনাসংক্রান্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। তাৎক্ষণিক কোনো জরিপও করা হয়নি। গত মাসে বিবিএসের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের এক ভার্চুয়াল সভায় করোনার কারণে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে একটি জরিপ করতে বলা হলেও বিবিএস থেকে তেমন সাড়া মেলেনি। যদিও অস্ট্রেলিয়া, কলম্বিয়া, ফিনল্যান্ড, মালয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, ঘানা, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইডেন, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতের পরিসংখ্যান ব্যুরো করোনার সময়ে বিভিন্ন ধরনের জরিপ করেছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১০টি শাখার মধ্যে শিল্প ও শ্রম শাখা থেকে পাওয়া যায় দেশে কতসংখ্যক মানুষ শ্রমশক্তিতে আছে, কতসংখ্যক মানুষ কর্মক্ষম, কতসংখ্যক মানুষ বেকার—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু করোনা প্রকোপের এই সময়টাতে কতসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়েছে, এর মধ্যে নারী ও পুরুষের সংখ্যা কত—এসব সম্পর্কে কোনো জরিপ করা হয়নি। বিবিএসের আরেকটি শাখা হলো স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা শাখা। করোনাকালীন মানুষের স্বাস্থ্যগত বিষয় নিয়ে এই শাখা থেকে কোনো কাজ হয়নি। আরেকটি শাখা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইং মোট দেশজ উৎপাদন জিডিপির প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে, মূল্যস্ফীতির হার কত এসব হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু সরকারের ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অন্যবার জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির তথ্য ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইং থেকে দেওয়া হলেও এবার দেওয়া হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। জুন মাসের মূল্যস্ফীতির হার কত তা এখনো জানা যায়নি। অথচ আফ্রিকার দেশ উগান্ডা তাদের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়ে ফেলেছে। এদিকে করোনার এই সময়ে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে প্রতি পরিবারকে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের তালিকা করতে গিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় সরকারকে। কারণ সরকারের হাতে দরিদ্র মানুষের কোনো তালিকা ছিল না। অথচ ২০১৩ সালে সারা দেশে ধনী-দরিদ্রের তালিকা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ২০১৭ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি শেষ হয়নি। দুই দফা বাড়িয়ে এখন প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২১ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে, আর ৩২৮ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় ৭২৭ কোটি টাকায় ঠেকেছে। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, বিবিএস যদি ওই তালিকাটি করতে পারত, তাহলে ত্রাণ নিয়ে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতো না। জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ডিডিজি ঘোষ সুবব্রত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিবিএস কোনো জরিপ করেনি।’ এই ধরনের জরিপ করার জন্য ওপর থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এদিকে করোনার কারণে দেশে কতসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, কতসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়েছে—এসব তথ্য সরকারি সংস্থা বিবিএস থেকে না পাওয়া গেলেও বেসরকারিভাবে গবেষণা করে বের করা হয়েছে। পিপিআরসি ও বিআইজিডি নামের দুটি বেসরকারি সংস্থা জরিপ করে দেখেছে, করোনার প্রভাবে দেশে ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশে নতুন করে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস)। সংস্থাটি বলেছে, মহামারির আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ শতাংশ। কিন্তু সংক্রমণ শুরুর পর টানা দুই মাসের সাধারণ ছুটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়ে গেছে ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর সংখ্যা চার কোটি ৮০ লাখ। করোনার কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান হাবিব মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা সংকটের সময় আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরোকে কিছুই করতে দেখিনি। কিংবা তাদের দিয়ে কিছুই করাতে চায়নি সরকার। সরকার নিয়মের বাইরে যেতে চায় না। নিয়মের বাইরেও মহামারির সময় যে কিছু একটা করা দরকার, তা বিবিএস মনেই করছে না। সরকার সব কিছু সফল দেখাতে চায়। তাই মহামারির মধ্যেও নতুন কোনো জরিপ হচ্ছে না। কারণ, জরিপ হলেই তো সঠিক তথ্য বের হয়ে আসবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা