kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

এখনো রেড জোনেই পূর্ব রাজাবাজার

বিচ্ছিন্ন লকডাউনে সুফল নিয়ে প্রশ্ন

► ২৮ দিনের সময়সীমা দিলেও লকডাউন তুলে নেওয়া হয় ২১ দিনে ►ওয়ারীতেও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, পরের ধাপে উত্তরায় নজর ► ঢাকায় ৮০টির বেশি রেড জোন ►জীবন-জীবিকার প্রশ্নে দেশে লকডাউন পদ্ধতি বাস্তবসম্মত নয় বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের

তৌফিক মারুফ   

৫ জুলাই, ২০২০ ০২:১৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিচ্ছিন্ন লকডাউনে সুফল নিয়ে প্রশ্ন

রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু করা হয়েছিল বহুল আলোচিত লকডাউন। পরীক্ষামূলক এ কার্যক্রম চলে ২১ দিন। এ সময় এলাকার মানুষ ছিল ঘরবন্দি। সংক্রমিতদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করা হয়েছে। যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ওষুধের দোকান ছাড়া এলাকার সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল। একটি বাদে এলাকায় আসা-যাওয়ার সব কটি পথ ছিল বন্ধ। যানবাহন চলাচলও ছিল না। এত কিছুর পরও এ লকডাউন কর্মসূচি সফল হয়নি। এলাকাটি এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই রেড জোনে।

অন্যদিকে অর্জন বলতে উঠে এসেছে শুধুই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা। এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে লকডাউন পদ্ধতি কার্যকর করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু পূর্ব রাজাবাজারের অভিজ্ঞতা সামনে রেখেই গতকাল শনিবার থেকে রাজধানীর ওয়ারীতে শুরু হয়েছে লকডাউন। ওয়ারীর পরে উত্তরার দিকে নজর রয়েছে। জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় এখন পর্যন্ত ৮০টি রেড জোন চিহ্নিত করা রয়েছে। দেশের ১৬টি জেলার বিভিন্ন এলাকায়ও স্থানীয়ভাবে লকডাউন চলছে।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ভিন্নমত পোষণ করে জোর দিয়েই বলেছেন, দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে কঠোর লকডাউনের কোনো বিকল্প নেই। তা করতে না পারলে সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি হবে। তখন মানুষের জীবন-জীবিকা আরো বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হবে।

পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, কোন এলাকায় বা কোন ঠিকানায় করোনা পজিটিভ রোগীর অবস্থান আছে, তা ম্যাপ আকারে চিহ্নিত করে কোন এলাকা কোন রঙের জোনের আওতায় পড়বে, তা সিটি করপোরেশনকে তাঁরা জানিয়ে দেন। সিটি করপোরেশনই ঠিক করে কোনো এলাকা লকডাউন করবে কি করবে না। তিনি বলছেন, তাঁরা যখন ঢাকার দুই সিটির রেড জোনের চিত্র সিটি করপোরেশনকে দিয়েছেন তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই উত্তর সিটির পূর্ব রাজাবাজার ও দক্ষিণ সিটির ওয়ারীকে পরীক্ষামূলক লকডাউনের জন্য নির্বাচন করেছে। কেন তারা রেড জোনভুক্ত অন্য কোনো এলাকা বাছাই করেনি, সেটা তারা বলতে পারবে।

ড. ফ্লোরা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে ওই লকডাউন এলাকাকে করোনামুক্ত করতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা, পরীক্ষার মাধ্যমে আক্রান্তদের খুঁজে বের করা, আক্রান্তরা যাদের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন বা অন্যকে তাঁরা আক্রান্ত করেছেন তাঁদের খুঁজে বের করা, প্রয়োজনমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করাসহ আরো কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আমরা যৌক্তিক কারণেই ২৮ দিনের সময়সীমা বলে দিয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম ২১ দিনের মাথায় লকডাউন শেষ করে দেওয়া দেওয়া হলো। তার মানে এক ধরনের মাঝপথ থেকেই কর্মসূচি শেষ হয়ে গেল।’

নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ড. ফ্লোরা বলেন, প্রথম ১৪ দিন বিভিন্ন অজুহাতে মানুষ বাইরে আসা-যাওয়া করেছে। ওই ১৪ দিনে যাদের পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে, ধরে নিতে হবে তারা লকডাউনের সময়সীমা শুরুর আগে ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। তাদের জন্য ওই সময়সীমা ঠিক থাকলেও এর মধ্যে নতুন করে যারা সংক্রমিত হয়েছে তাদের জন্য আরো ১৪ দিন সময় অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমরা এই লকডাউনের কার্যকর ফলাফলটি পাচ্ছি না। কারণ লকডাউন সময়ের মধ্যে যাঁরা সংক্রমিত হয়েছেন তাঁরা সংক্রমণমুক্ত হওয়ার আর সময় পেলেন না। এলাকাটিও সংক্রমণমুক্ত হওয়ার আগেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেছে। ফলে সংক্রমণ আরো বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব কারণে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে আমরা এখনো পূর্ব রাজাবাজারকে রেড জোন হিসেবেই পাচ্ছি। গ্রিন জোন তো পরের কথা, আপাতত ইয়েলো জোনেও নেওয়া যাচ্ছে না। যদিও যে বাড়িগুলোতে আক্রান্তরা আছেন, সেগুলো লকডাউনের আওতায় রাখার জন্য বলা হয়েছে।’

সরকার গঠিত জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যসচিব ড. ফ্লোরা আরো বলেন, ‘আমার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মানুষের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রেখে লকডাউন কার্যকর করা বাস্তবসম্মত হচ্ছে না। আবার এলাকাভিত্তিক লকডাউনও খুব একটা কাজে আসে না।’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপটি ছিল একদম প্রথমে, যখন উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন দেশগুলো থেকে মানুষ দেশে ঢুকছিল, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সেটা আমরা করতে পারিনি। এর পরও আরো একাধিক ট্রেন মিস করেছি। এখন এই খণ্ড খণ্ড লকডাউন দিয়ে কিছু আত্মতুষ্টি খোঁজার চেষ্টা চলছে। যে এলাকায় লকডাউন হচ্ছে সেখানকার চারপাশে তো খোলা থাকছে। ২৮ দিন নিরাপদ থেকে কোনো লোক যদি পরের দিন বাইরে যায়, সেখান থেকে তো তার সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই গেল। তাহলে ওই ২৮ দিনের স্থায়ী কোনো ফলও পাওয়া গেল না। এ ছাড়া লকডাউনকৃত এলাকায় যে ব্যবস্থাপনাগুলো রাখা দরকার সেটার সক্ষমতাও আমাদের কতটা আছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।’

আরেক রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে এলাকাভিত্তিক লকডাউনে সুফল আসবে না। ঢাকার পুরো এলাকা একই সময়ে বা বড়জোর পাঁচ থেকে সাত দিনের ব্যবধানে লকডাউন করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া পরিকল্পনা সেভাবে করা দরকার, যাতে ওই এলাকার দরিদ্র সব জনগোষ্ঠীর খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। উদ্যোক্তাদের আয়োজনে আইসোলেশন সেন্টার বানিয়ে বা কাছাকাছি কোনো আইসোলেশন সেন্টারে উপসর্গধারীদের রেখে খাওয়াদাওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব সাপোর্ট দিতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে নজীর আহম্মেদ বলেন, লকডাউন বলা হলেও মূল বিষয়টি হচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। সংক্রমণ যে পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তাতে এখন আর বিচ্ছিন্নভাবে লকডাউন করে স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। একসঙ্গে সব কটি রেড জোন যদি লকডাউন করা যায়, তবেই শুধু ভালো ফল পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, পূর্ব রাজবাজারে বেশ কিছু ভালো উদাহরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, এলাকার স্বেচ্ছাসেবী জনস্বাস্থ্য দল অনেক কাজ করেছে। তালিকা ধরে আক্রান্তদের খুঁজে বের করা, যাদের মাধ্যমে তারা আক্রান্ত হয়েছে এবং তারা যাদের আক্রান্ত করেছে তাদের খুঁজে বের করেছে স্বেচ্ছাসেবীরা। মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রীও সরবরাহ করেছে নিরলসভাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা