kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

করোনাকালের দিনলিপি

স্বজন হারানোর ব্যথায় মন ভালো রাখি কী করে : ববিতা

দাউদ হোসাইন রনি   

৪ জুলাই, ২০২০ ০২:৩৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বজন হারানোর ব্যথায় মন ভালো রাখি কী করে : ববিতা

মানসিকভাবে কিছুটা অবসাদগ্রস্ত সত্যজিৎ রায়ের ‘অনঙ্গ বউ’। এমনিতে তিনি একা মানুষ। গুলশানের ফ্ল্যাটে একাই থাকেন। করোনা এই একাকিত্বকে আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েছে। তার ওপর সম্প্রতি হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন নিকট স্বজনকে। প্রিয়জন হারানোর ব্যথায় কাতর ৬৬ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী। ফোনের ওপারে তাঁর কণ্ঠে ঝরে সে ব্যথার সুর, ‘আমার চাচা-ফুফুদের পরিবার বেশ বড়। কাজিনদের পরিবারও কম না। চাচাতো বোনের ছেলে, ফুফাতো বোনসহ আমার পরিবারের পাঁচ-ছয়জনকে কেড়ে নিয়েছে করোনা। ভাগ্নেটার বয়স সবে চল্লিশ। এটা কি মৃত্যুর বয়স হলো? মনটা ভালো রাখি কী করে!’

মন খারাপের নেপথ্যে আরো অনেক কারণ। বড় বোন অভিনেত্রী সুচন্দা করোনায় আটকা পড়েছেন আমেরিকায়। তিন ভাই থাকেন তিন দেশে। আর একমাত্র ছেলে অনিক কানাডায়। অবশ্য ছোট বোন অভিনেত্রী চম্পা ঢাকাতেই আছেন। বলেন, ‘থাকলে কী হবে, দেখা-সাক্ষাৎ তো নেই কারো সঙ্গে। ফোনেই যা কতটুকু কথা। বছরে দুইবার ছেলের কাছে গিয়ে বেড়িয়ে আসতাম। মে মাসে যাওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে সেটাও পারিনি। ছেলেটাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছি। অনিক ওখানকার বড় চাকুরে। বাসায় বসেই এখন অফিস করছে। ও ওই দেশের নাগরিক। আমি তা নই। আগে ভ্রমণ ভিসায় যেতাম। এ পরিস্থিতিতে আমাকে ওই দেশে ঢুকতে দেবে বলে মনে হয় না। কবে অনুমতি পাব, সেটাও জানি না। করোনা যে কত দিন থাকবে, তারও তো নিশ্চয়তা নেই।’

করোনা থেকে নিজেকে রক্ষায় যা যা করা প্রয়োজন তার সবই করছেন দেশবরেণ্য এই অভিনেত্রী। ‘প্রায় চার মাস স্বেচ্ছা ঘরবন্দি আছি। বাসায় দুজন গৃহপরিচারিকা আছেন। তবু বাসার কাজ নিজেই করি। আমার ধারণা, আমি যতটা করোনা সচেতন, গৃহপরিচারিকারা হয়তো ততটা নন। শোবার ঘর ও বসার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া যে ছাদখোলা বারান্দা, সেখানে রীতিমতো ক্ষেতখামারি করছি। নানা রকম ফুল-ফলের গাছও আছে। চাষ করছি শাকসবজিও। দিনের বড় একটা সময় সেখানে ব্যস্ত থাকি। গাছে পানি দেওয়া, আগাছা সাফ করা। বাইরের শাকসবজি একেবারেই খাই না। লাল শাক, পুঁই শাক আমার বাগান থেকেই পাই।’

এ বিরুদ্ধ সময়টায় বাইরের কেউ তাঁর বাসায় আসছেন না। ইলেকট্রিশিয়ান, দারোয়ান কেউ না। কাঁচাবাজারের দরকার পড়লে দারোয়ানদের কেউ যায় সুপারশপে। দরজার সামনে বাজারের ব্যাগ রেখে গেলে পরে বাসায় এনে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করেন। মাছ-মাংস আনলে নিয়ম মেনে পানিতে ভিজিয়ে রাখেন দীর্ঘ সময়। আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া বাংলাদেশের এই অভিনেত্রী কতটা সচেতন সেটা বোঝা গেল তাঁর কথায়, ‘ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এনেই আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখি না। আগে কড়া রোদে ভালোমতো রেখে দিই কয়েক ঘণ্টা। বলা তো যায় না কোন ফাঁকে করোনা ঢুকে পড়ে বাসায়!’

কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাখ্যাও দিলেন আটবার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এই অভিনেত্রী, ‘আমার আত্মীয়-স্বজনদের যাঁরা করোনায় মারা গেছেন, তাঁদের কেউই অসচেতন ছিলেন না। নিয়ম মেনে বাসাতেই ছিলেন। হয়তো লিফটের বাটন চেপে বাড়ির ছাদে উঠেছেন, অজান্তে সামান্য কিছু ভুল করে ফেলেছেন, তাতেই আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। আমি সজ্ঞানে সে রকম কোনো ভুল করতে চাই না।’

দীর্ঘদিন টানা বাসায় অবস্থান এবং পরিপার্শ্বের কারণে অবসাদ কাটাতে, শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত থাকতে প্রতিদিন ঘরেই অন্তত দেড় ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করেন। চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ‘সি’ ও ভিটামিন ‘ডি’ খাচ্ছেন। ববিতা বিশ্বাস করেন, করোনা মানুষের পাপের ফল। বলেন, ‘প্রকৃতির প্রতি মানুষের নিষ্ঠুর আচরণের বদলা নিচ্ছে করোনা। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ক্ষমা করেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা