kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

চামড়াশিল্প রক্ষায় আসছে একগুচ্ছ প্রণোদনা

বিশেষ ব্যবস্থায় ৬০০ কোটি টাকা দেবে ব্যাংক

সজীব হোম রায়   

৪ জুলাই, ২০২০ ০২:২৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চামড়াশিল্প রক্ষায় আসছে একগুচ্ছ প্রণোদনা

চামড়া খাতে পাহাড়সম সমস্যা। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে এ সমস্যা আরো বেড়েছে। সামনেই কোরবানির ঈদ, চামড়া ব্যবসায়ীদের মূল সময়। এ অবস্থায় চামড়াশিল্প টিকিয়ে রাখতে একগুচ্ছ সুবিধা দিতে যাচ্ছে সরকার। এ ছাড়া চামড়াশিল্পের জন্য শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেবে। এ জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বর্তমানে চামড়াশিল্প কোনো প্রণোদনা প্যাকেজে নেই। এখন খাতটিকে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ব্যবসায়ীরা যাতে চামড়া কিনতে পারেন সে জন্য সরকারি চার ব্যাংক বিশেষ ব্যবস্থায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। ঈদের আগেই এসব প্রণোদনা দেওয়া হবে। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা এ খাতের জন্য দেওয়া কোনো সুবিধাই পাবেন না। বিষয়টি তদারকি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর পরও যাঁরা ব্যবসা করতে চান তাঁদের পুনরর্থায়ন সুবিধা দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। আর যাঁরা ব্যবসা করতে চাইবেন না তাঁদের জন্য ‘এক্সিট প্ল্যান’ দেওয়া হতে পারে।

কিন্তু সরকারের এসব উদ্যোগেও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না চামড়া ব্যবসায়ীরা। তাঁরা তিন বছরের ব্যাংকঋণ মওকুফসহ নানা দাবি জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চামড়াশিল্পকে বাঁচাতে আমরা কাজ করছি। তাঁদের (ব্যবসায়ীদের) দাবি অনেক। সব দাবি তো মানা সম্ভব না। এ খাত প্রণোদনা প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে কোনো সমস্যা নেই। কিছু বিষয় পর্যালোচনা বা শিথিল করতে হবে। আমরা সেটি দেখছি। সমস্যা হলো, এই সেক্টরের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হয়ে আছেন। ঋণ নিয়মিত না করলে ব্যাংকগুলো আবার টাকা দেবে কেন?’ তিনি বলেন, ট্যানারি খাত সাভারে গেছে। অনেক টাকা খরচ করেছে। কিন্তু কাজ এখনো বাকি। অনেকেরই সনদ নেই। এ খাতে অনেক সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানেই তাঁরা কাজ করছেন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে কী ছাড় দেওয়া যায় সেটা তাঁরা দেখছেন। ঈদের আগেই সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি মনে করেন।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘সমস্যার কারণেই চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের অনেকে খেলাপি হয়েছেন। তবে যাঁরা ভালো ঋণগ্রহীতা তাঁদের আমরা টাকা দেব।’

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. শামসুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি চামড়া খাতকে সাহায্য করার জন্য। সরকার যেভাবে বলবে আমরা সেভাবেই উদ্যোগ নেব।’

সূত্র মতে, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভার যাওয়ার পর থেকেই চামড়া খাতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। প্লট বরাদ্দের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো কোনো কোনো ইউনিটে অবকাঠামোই তৈরি হয়নি। স্থানান্তরপ্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রায় ২২৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে আছে। কিছু কারখানা চালু হলেও ছোট-বড় দেড় শতাধিক ট্যানারি এখনো বন্ধ। আর বন্দরনগরী চট্টগ্রামে একসময় ২২টি ট্যানারি থাকলেও ২১টিই একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের চামড়াজাত পণ্যের প্রধান ক্রেতাদের অন্যতম চীন। চীন-যুক্তরাষ্ট্র ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ এবং চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনার কারণে বিভিন্ন পণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে। এর ভুক্তভোগী বাংলাদেশের চামড়াশিল্পও। সব মিলিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৪১ শতাংশ কমে গেছে। বেড়েছে ঋণখেলাপির সংখ্যা। তাই ব্যাংকগুলো এখন আর চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে চায় না। কোরবানির ঈদের আগে বাধ্য হয়ে চামড়া ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছেন।

জানা গেছে, ঈদের আগেই যাতে সমস্যার সমাধান হয় সে জন্য সরকারি ব্যাংকগুলোকে চামড়া খাতে ঋণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ঋণ পরিশোধে নিয়মিতদের বিশেষ ব্যবস্থায় অর্থায়ন করা হবে। ক্ষেত্রবিশেষে ঋণ দেওয়ার শর্ত আরো সহজ করবে ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চার ব্যাংক মিলে মোট ৫৮৬ কোটি টাকা ঋণ দেবে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক দেবে ৭১ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংক দিবে ১৮০ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বছর ৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে তারা ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টিই খেলাপি হয়ে গেছে। বাকি ৩৩টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত। অগ্রণী ব্যাংকও ১৮০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। রূপালী ব্যাংক দেবে ১৫৫ কোটি টাকা। স্বল্পমেয়াদে এ ঋণ দেবে ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা যাতে ব্যাংক ঋণ মেটাতে পারেন সে জন্য মজুদ পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অবশ্য সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেছেন, ব্যাংকগুলোর ঋণে শুভংকরের ফাঁকি আছে। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের অবস্থা এখন আগের মতো নেই। গত বছর ব্যাংকগুলো শুধু ৬০-৭০ কোটি টাকা দিয়েছে। ব্যাংকগুলো শুধু নিয়মিত গ্রাহকদের টাকা দিচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি এসব ঋণ অনেকেই পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে তাঁরা এবারও ঋণ পাবেন না। এতে এ শিল্প আরো বিপদে পড়বে।’

জানা গেছে, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে চামড়াশিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্যাকেজের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত কিছুটা শিথিল বা আরো উদার করা হতে পারে। বিষয়টি অর্থ বিভাগ বিবেচনা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এটি পুনঃ পরীক্ষা করবে। এ সুবিধা পেলে চামড়াশিল্প চলতি মূলধন পাবে।

এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য যে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে সেই কমিটি পণ্য বহুমুখীকরণসহ রপ্তানিতে এক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে কাজ করবে। কাঁচা চামড়া ধোয়া বা সংরক্ষণের জন্য লবণের যাতে ঘাটতি না হয় সে জন্য শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করবে।

এসব উদ্যোগেও খুব একটা সন্তুষ্ট নন চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা। গত সোমবার তাঁরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো, ২০১৭-২০২০ সাল পর্যন্ত তিন বছরের ব্যাংক ঋণ মওকুফ, ব্লক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর এবং মরাটরিয়াম সুবিধা দেওয়া। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ দাবিগুলো মানলে তাঁদের সুদিন আবারও ফিরে আসবে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এ দাবিগুলো মানার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে নতুন করে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিতে হবে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প মারা যাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা