kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

মহামারিতে মুনাফা নয়, টিকে থাকাটা জরুরি

জিয়াদুল ইসলাম   

১ জুলাই, ২০২০ ০২:১৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মহামারিতে মুনাফা নয়, টিকে থাকাটা জরুরি

প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে সেরা ব্যাংক হতে চায় সোনালী ব্যাংক। গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ব্যাংকের কর্মীরা। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আতাউর রহমান প্রধান। তিনি মনে করেন, করোনার এই কালবেলায় মুনাফা নয়, ব্যাংকের টিকে থাকাই জরুরি। তাঁর ভাষায়, শুধু নিজে টিকে থাকলেই হবে না, ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা বা গ্রাহকদেরও টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। গ্রাহকরা টিকে থাকলে ব্যাংকও টিকবে, তখন অর্থনীতিও সচল থাকবে। তাই আমাদের আরো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে।

আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘আমাদের এ বছর প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা মুনাফার লক্ষ্য ছিল এবং বছরের শুরুতে আমরা সেভাবেই একটি পরিকল্পনা করেছিলাম; কিন্তু করোনার শুরুটা হলো বছরের প্রথমেই। বছরের প্রথম দুই মাসে আমাদের যে মুনাফা ছিল, সেটা যদি অব্যাহত থাকত তাহলে হয়তো আমাদের যে টার্গেট ছিল সেটা অর্জন বা তার কাছাকাছি যেতে পারতাম। কিন্তু করোনা সব কিছু ওলটপালট করে দিল।’

তিনি বলেন, কভিড-১৯ শুধু কোনো ব্যাংকের একক বিষয় নয়। করোনার প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পূর্বপরিকল্পনা থেকে সরতে হচ্ছে আমাদের ব্যাংকগুলোরও। তবে করোনার কারণে ডিপোজিট যে হারে কমার আশঙ্কা করেছিলাম, সে হারে কমেনি। বরং সেভিংস ডিপোজিট বেড়েছে। গত ২৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছুঁয়েছে। এখন বাজারে বৈদেশিক মুদ্রারও কোনো সংকট নেই।

সোনালী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘কভিড-১৯-এর ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার এরই মধ্যে এক লাখ তিন হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্রণোদনাগুলো একেবারেই জরুরি ছিল এবং আমি মনে করি, যেকোনো দেশের চিন্তার আগেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেটা করেছেন। এই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের গাইডলাইন যথাসময়ে করে ব্যাংকগুলোকে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংকগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। বড় শিল্প ও সেবা খাতের ৩০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের আওতায় সোনালী ব্যাংক বিমানকে এক হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন করেছে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন-ভাতার জন্য যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হয়েছিল, সেই তহবিলের ঋণও প্রায় সব ব্যাংক সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে যথাসময়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এভাবে আমরা সরকারের প্রণোদনা বাস্তবায়নের কাজে অংশগ্রহণ করছি।’

আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘মহামারির এই সংকটকালে ব্যাংকের মুনাফা করাটা জরুরি না, টিকে থাকাই জরুরি। আমাদের টিকে থাকতে হলে গ্রাহক তথা যারা আমাদের ভালো ঋণগ্রহীতা বা নিয়মিত গ্রাহক, কিন্তু করোনার কারণে এখন সংকটে পড়েছে, তাদেরও টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে। তাদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ তাদের টিকিয়ে রাখতে পারলে ব্যাংকগুলোও টিকে যাবে। তখন অর্থনীতিও সচল থাকবে। করোনা ঠিকমতো মোকাবেলা করে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করা সম্ভব হলে অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে না।’

৯ শতাংশ সুদ কার্যকরের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরবে কি না—জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের সিইও বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে যে সুদের হার ছিল, সেটা ডাবল ডিজিটে ছিল। ফলে এই সুদে টাকা লগ্নি করে ব্যবসা করে প্রফিট করা আসলেই কঠিন ছিল। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে শিল্পায়নের স্বার্থে ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিতে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন। আমরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেড় বছর আগেই এটা কার্যকর করি। অনেকেই মনে করেছিলেন, এতে ব্যাংকের মুনাফা অনেক কমে যাবে। কিছুটা মুনাফা হয়তো কমেছে, কিন্তু এতে ব্যাংকগুলো খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। একই সঙ্গে ৯ শতাংশ সুদের ফলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃস্টি হয়েছে। আমি মনে করি, ৯ শতাংশ সুদ হওয়ায় বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা আছে।’

খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সোনালী ব্যাংক কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তরে আতাউর রহমান প্রধান বলছিলেন, ‘আমরা ধাপে ধাপে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি করেছি। আশা করছি, আমরা এ বছরেই আরো উন্নতি করতে পারব।’

করোনাভাইরাসের মধ্যেও প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগিয়ে সোনালী ব্যাংক গ্রাহকের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে বলে জানান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘করোনা আমাদের অনেক নতুন নতুন জিনিস শিখিয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার এই সময় আমাদের অনেক বেশি কাজে লাগছে। আমরা এখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করছি, কিন্তু কাজের কোনো ঘাটতি হচ্ছে না। প্রতি সপ্তাহে ভার্চুয়াল বোর্ড মিটিং করছে সোনালী ব্যাংক। এই করোনাকালে অ্যাকাউন্ট খুলতে গ্রাহকদের যেন ব্যাংকে আসতে না হয়, সে জন্য আমরা একটি অ্যাপ চালু করেছি। এরই মধ্যে ১০-১১ হাজার অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ৫০ হাজার গ্রাহক অ্যাপটি ডাউনলোড করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে সোনালী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেনশন দেওয়া হতো ম্যানুয়ালি। কিন্তু গত ২৫ জুন থেকে অনলাইনের মাধ্যমে তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা এটিএম বুথের কার্যক্রম বাড়িয়েছি। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা যাতে আরো সহজলভ্য হয়, সে বিষয়ে নজর দিচ্ছি।’ 

তিনি আরো বলেন, “আগেও আমি সোনালী ব্যাংকে ৩০ বছরের বেশি কাজ করেছি। সেই ব্যাংকেই আমাকে এখন এমডির দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। আমাদের স্লোগান—‘দীপ্ত শপথ মুজিববর্ষে, আমরা যাব সবার শীর্ষে’। করোনায় কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও আমাদের স্লোগানের যে আঁচ, সে উদ্যমেই এগোতে চাই।”

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা