kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

এখনো স্বীকৃতি না পেলেও দিচ্ছে হাসপাতালগুলো

দেশে করোনা চিকিৎসায় যে ওষুধটি এক নম্বরে!

তৌফিক মারুফ    

২৯ জুন, ২০২০ ০৬:৩৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশে করোনা চিকিৎসায় যে ওষুধটি এক নম্বরে!

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারি শুরুর পর দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা দিশাহারা হয়ে পড়েন এই ভাইরাস মোকাবেলার পাশাপাশি চিকিৎসার নানা দিক নিয়ে। বিশেষ করে ভ্যাকসিন ও ওষুধ নিয়ে শুরু হয় একের পর এক নানামুখী গবেষণা। নতুন কোনো ওষুধ পাওয়া না গেলেও পুরনো বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের উপসর্গ অনুসারে ব্যবহার করা শুরু হয়। কোথাও কোনো ওষুধের গবেষণায় ন্যূনতম সাফল্যের খবর প্রচার হতে না হতেই বিশ্বব্যাপী ওই ওষুধ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চিকিৎসক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। এই তালিকায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন+ অ্যাজিথ্রোমাইসিন, রেমডেসিভির, ফেভিপিরাভির, আইভারমেকটিন +ডক্সিসাইক্লিন এবং সব শেষে যুক্ত হয় ডেক্সামেথাসনের নাম।

 

আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন এখন সর্বজনিন

বাংলাদেশে এর সবই কমবেশি ব্যবহার হয়েছে ও হচ্ছে, যার মধ্যে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন পিছু হটলেও অন্যগুলো এখনো রয়েছে ব্যবহারের তালিকায়। তবে দেশে এখন করোনা চিকিৎসায় যেন সর্বজনিন হয়ে উঠেছে অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল ক্যাটাগরির জেনেরিক আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন ওষুধ। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই করোনার রোগীদের জন্য এটি রয়েছে তালিকার শীর্ষে। সেই সঙ্গে যাঁরা আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে বাসা-বাড়িতে অবস্থান করছেন তাঁরাও চিকিৎসকের পরামর্শে সবার আগে রাখছেন এই আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন। দেশে প্রথম এই আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন ডোজ শুরু করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. তারেক আলম।

 

কালের কণ্ঠর সেই প্রতিবেদন!

পরীক্ষামূলকভাবে ৬০ জন রোগীর ওপর এই ওষুধ প্রয়োগ করে সাফল্য পাওয়ার খবর প্রথম ছাপা হয়  গত ১৬ মে কালের কণ্ঠে। https://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2020/05/16/912204 ..

"দেশে করোনা চিকিৎসায় বড় সাফল্য- দুটি ওষুধের সম্মিলিত ব্যবহারে তিন দিনে ৫০% সুস্থ, চার দিনে শতভাগ"- শীর্ষক প্রতিবেদনে।

এরপর থেকেই দ্রুত এই ওষুধের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। যদিও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী সংস্থা বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল-বিএমআরসি থেকে এই ওষুধের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে আইসিডিডিআরবি এই ওষুধ নিয়ে কয়েকটি হাসপাতালের রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে। অধ্যাপক তারেক আলম ও আইসিডিডিআরবি আলাদা করে এই ওষুধের প্রয়োগজনিত অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রটোকল জমা দিয়েছেন বিএমআরসির কাছে।

 

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ'র বক্তব্য

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা কমিটির সিনিয়র সদস্য, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, হাতের কাছে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান না পাওয়ায় সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ওষুধ হিসেবে আইভারমেকটিন সবাই ব্যবহার করছে। তবে কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধই ব্যবহার করা যাবে না।

 

সেই তারেক আলম ্‌এখন কী বলছেন?

অধ্যাপক ডা. তারেক আলম কালের কণ্ঠকে গতকাল বলেন, ‘আমি অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল মেডিসিন আইভারমেকটিনের সিঙ্গল ডোজের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মাত্র তিন দিনে ৫০ শতাংশ লক্ষণ কমে যাওয়া আর চার দিনে করোনাভাইরাস টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসার সাফল্য পেয়েছি।’

তিনি বলেন, “ওষুধ দুটি এর আগেও সার্স মহামারির সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। আমি নিশ্চিত করেই বলছি, ওষুধ দুটির সম্মিলিত ব্যবহার করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এখন পর্যন্ত অন্য ওষুধের চেয়ে ভালো ফল দিচ্ছে। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওষুধ দুটির সফল স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। আর আমাদের ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে’ এই ওষুধের পরীক্ষামূলক কাজে আমার সঙ্গে ছিলেন ‘সম্মান ফাউন্ডেশন’ ও অধ্যাপক ডা. রুবাইয়ুল মোরশেদ। এখন আমি অপেক্ষায় আছি বিএমআরসির অনুমোদনের।”

 

দেশে করোনা চিকিৎসায় বড় সাফল্য

অধ্যাপক ডা. তারেক আলম

 

ডা. তারেক আলম এই ওষুধ ব্যবহারের প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে বলেন, ‘প্রথম আমি এই আইভারমেকটিনের ব্যবহারে সাফল্যের খবরটি পাই অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সূত্র থেকে। তখন থেকেই বিষয়টি আমার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। এরই একপর্যায়ে আমাদের এক সহকর্মী করোনায় আক্রান্ত হন। তিনি আমার শরণাপন্ন হলে আমি প্রথমে তাঁকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের পরামর্শ দিই। কিন্তু কেন যেন তিনি সেটা ব্যবহার করবেন না বলে আমাকে জানান এবং অন্য কোনো ওষুধ থাকলে দিতে বলেন। তখন আমি তাঁকে আইভারমেকটিন+ ডক্সিসাইক্লিন খেতে বলি। তিনি তা খাওয়ার চারদিন পরে পরীক্ষা করে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন তাঁর করোনা শেষ। সেখান থেকেই শুরু। এর পরই আমি দ্বিতীয় দফায় ওষুধটি প্রয়োগ করি বিদেশি দুজন শিক্ষার্থীর ওপর। তাঁরাও চার দিনে করোনামুক্ত হয়েছেন। সেখান থেকে ভরসা পেয়ে আমি আমাদের কিছু আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে উপসর্গ ও পরীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে এই ওষুধ ব্যবহার করতে দিই। সেখান থেকেও সাফল্য আসে।

পরে কয়েকজন রোগীকেও এই ওষুধ দিই। সব মিলিয়ে দেড় মাসে ৬০ জন রোগীকে এই ওষুধ দেওয়ার পর সাফল্য পাওয়ায় আমি নিশ্চিত হই এটা করোনা আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সফল হচ্ছে। আর গণমাধ্যমের মধ্যে প্রথম এই বিষয়টি কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়ার পর চারদিক থেকে এটি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহজনক সাড়া পাওয়া যায়। এখন সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেই এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। যা জেনে-শুনে খুবই ভালো লাগছে। সেই সঙ্গে আমি চলতি মাসের শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিক একটি গবেষণা প্রটোকল তৈরি করে বিএমআরসির কাছে জমা দিয়েছি। এখন পর্যন্ত অনুমোদন না পেলেও বিএমআরসি এটি নিয়ে কাজ করছে। তারা কয়েকবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শুনেছি পরে আইসিডিডিআরবি এই ওষুধ নিয়ে ট্রায়াল শুরু করেছে। তাদেরকেও আমি স্বাগত জানাই।’

 

"কিছু তথ্যের ঘাটতি ছিল এখন পাওয়া গেছে"

বিএমআরসির পরিচালক ডা. মাহমুদ উদ জাহান কালের কণ্ঠকে গতকাল বলেন, ‘অধ্যাপক ডা. তারেক আলমের প্রটোকল আরো আগেই আমরা পেয়েছি। সেটা নিয়ে কাজ চলছে। কিছু তথ্যের ঘাটতি ছিল সেগুলো এখন পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে পর্যালোচনায় কিছুটা সময় লাগছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে। এ ছাড়া পরে আইসিডিডিআরবির কাছ থেকেও আরেকটি প্রটোকল জমা পড়েছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য।’

এদিকে এই আইভারমেকটিন এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে করোনা চিকিৎসার জন্য অনুমোদন না পেলেও সরকারি সব হাসপাতালেই করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের তালিকার শুরুতেই রয়েছে এই আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন।

 

সবাই দিচ্ছে, আমরাও ব্যবহার করছি:  জামিল আহম্মেদ

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ থাকলেই এখন আইভারমেকটিন+ ডক্সিসাইক্লিন দেওয়ার কথা বলা হয়। এটা এখনো কোনো প্রটোকলে না ঢুকলেও যেহেতু এখন পর্যন্ত করোনার কোনো নিশ্চিত ওষুধ মিলছে না, তাই যখন যতটুকু ভরসা পাওয়া যায় সেটাই ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ ছাড়া এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যেহেতু তেমন কিছু নেই, তাই সবাই দিচ্ছে, আমরাও ব্যবহার করছি।’

স্কয়ার হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁদের ক্যান্সারের নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি আমি আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন দিয়ে করোনা নেগেটিভ করতে পেরেছি।’

এভারকেয়ার হাসপাতালের পরিচালক (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা) ডা. আরিফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্য হাসপাতালগুলোর মতোই আমরা মৃদু থেকে মধ্যম পর্যায়ের করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিন দিয়ে থাকি। যারা সিভিয়ার পর্যায়ে থাকে তাদেরকে আরো কয়েক ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়।’

 

ডা. আহমেদুল কবীরের ভিন্নমত 

তবে বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর ওষুধ দুটির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, আইভারমেকটিন+ডক্সিসাইক্লিনে করোনামুক্ত হয় এই কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বিশ্বের কোথাও নেই। আমাদের দেশে কিছু প্রচার-প্রচারণায় মানুষ এই ওষুধ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। বলতে গেলে এমন কোনো মানুষ নেই যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েই প্রথম এই ওষুধ না খাচ্ছে। যদি এই ওষুধ কার্যকরই হতো তবে কেন এত মানুষ জটিল অবস্থায় হাসপাতালে যাচ্ছে, কেন প্রতিদিন এত মানুষ মারা যাচ্ছে। আর এটা নিয়ে কোনো গবেষণাও হয়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা