kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

ব্যতিক্রমী করোনাট্য নিয়ে মানুষের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ মে, ২০২০ ২২:৩২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্যতিক্রমী করোনাট্য নিয়ে মানুষের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

করোনা মোকাবিলায় দুইমাসের অধিক সময় ধরে চলতে থাকা সাধারণ ছুটি আর বিভিন্ন স্থানে চলমান লকডাউনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাক্তি উদ্যোগে অসহায় মানুষের জন্য দিনরাত কাজ করে চলেছেন অনেকেই। সেরকমই একটি দল ঝিনাইদহের ভাটই বাজারের করোনা স্কোয়াড। প্রান্তিক মানুষকে সচেতন করতে, তাদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে সেবার গাড়ি নিয়ে পথে নেমেছে এক ঝাঁক স্থানীয় যুবক, নেতৃত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ঝিনাইদহের নাট্যকার ও নির্দেশক হীরক মুশফিক। ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের এই শিক্ষকের উদ্যোগে, শৈলকূপার ভাটই বাজার কেন্দ্রীক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের একঝাঁক ছাত্রদের নিয়ে করোনা দুর্গতদের সচেতনায়ন ও সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয় "করোনা স্কোয়াড এক" নামের স্বেচ্ছাসেবী দল। গ্রামাঞ্চলের অসচেতন মানুষকে করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সাধারণকে সহায়তা করা, কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন সম্পর্কিত ধারণা প্রদান এবং অসহায়, কর্মহীন মানুষকে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মাধ্যমে সাহায্য করা, ইফতার সামগ্রী, ইদ উপহার, নগদ অর্থ প্রদানের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।

এলাকা ভিত্তিক সেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে এবং ফেসবুক গ্রুপে কমেন্ট, মেসেজ বা ফোন কলের  মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করে যাচাই-বাছাই করে অসহায় মানুষের ঘরে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দিচ্ছে তারা। চক্ষুলজ্জায় যারা কাউকে কিছু বলতে পারে না সেইসব মধ্যবিত্তদের জন্য র‍য়েছে হট লাইন ব্যবস্থা। হটলাইনে ফোন করলে গোপনে জরুরি খাদ্য বা অর্থ পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে তারা। এই দলের সবচাইতে আকর্ষণীয় ব্যতিক্রমী সেবার নাম 'সেবার গাড়ি'। সেবার গাড়িতে রয়েছে শাক সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী।

দুস্থদের মাঝে বিনামূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি বাজার নিয়ে গ্রামের নিম্নবিত্তের বাড়ির সামনে পৌঁছে যাচ্ছে এ গাড়ি। সেবার গাড়ির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ছয়শতাধিক পরিবারের মাঝে রমজানের উপহার হিসেবে বিনামূল্যে শাক সবজি বিতরণসহ দুই শতাধিক পরিবারের মাঝে ইফতার সামগ্রী ও ঈদ উপহার বিতরণ করেছে এ দলটি। এ ছাড়া ঝিনাইদহ অঞ্চলের রোজগারহীন লোকশিল্পী ও ঘূর্ণিঝড় আম্ফান দুর্গতদের মাঝে ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ করা হয়। 

তবে সেবার গাড়ির অন্যতম বিশেষত্ব একটি নাট্য প্রক্রিয়া। তাৎক্ষণিক অভিনয় বা ইম্প্রোভাইজেশনের মাধ্যমে যার অবতারণা করা হয়। সেবার গাড়ির সাথেই থাকেন দুইজন অভিনেতা। করোনায় অসচেতন গ্রামের  সাধারণ মানুষ এই নাট্যের দর্শক। কেননা সচেতন মানুষেরা করোনাকালে প্রয়োজন ছাড়া কখনই বাইরে থাকবেন না।  ফলে মূলত অসচেতন জনসমষ্টিকে উদ্দেশ্য করেই এ ধরণের নাট্যপ্রক্রিয়া।

প্রথমিক পর্যায়ে মূলত পূর্বনির্ধারিত দুটি চরিত্রের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ, পরিণতি, প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কিত অভিনয়ের মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে সচেতন করবার। যা যথেষ্ট কার্যকরী হচ্ছে বলেও জানা গেছে। নতুন এই নাট্যপদ্ধতির সমসাময়িকতা বিচারে এর উদ্ভাবক ও নির্দেশক  হীরক মুশফিক এটির নাম দিয়েছেন 'করোনাট্য'। নামকরণের ক্ষেত্রে প্রথমত প্রাধান্য পেয়েছে করোনা কালের নাট্য বিষয়টি এ ছাড়া 'সব সংকটে নাটকের প্রয়োগ হোক' এমন আহবান থেকেও এ নামকরণ হয়েছে বলে জানা যায়। 

এ বিষয়ে 'করোনাট্য'এর উদ্ভাবক হীরক মুশফিক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে, ব্যাপারটি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা করছি বেশ কিছুদিন ধরে। এমনকি দুজন পারফর্মার ছাড়া দলের বাকি সদস্যদেরকেও বুঝতেই দেইনি। তবে অভিনেতারা আরেকটু দক্ষ হয়ে উঠলে ঠিকঠাক প্রয়োগে আরো  ভালো ফল পাবো আশা করছি।' 

তিনি বলেন 'নাট্যের এমন প্রয়োগ নানা সময়ে নানা ভাবে হয়েছে, যেহেতু নাটক একটি সম্মিলিত শিল্প ফলে এই করোনাকালে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে এটি সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বে করোনার সময়ে এখনো পর্যন্ত আর কেউ এধরণের নাট্য পদ্ধতির প্রয়োগ করেছে বলে আমার জানা নেই, তবে পূর্বে বিভিন্ন দেশে মূলধারা থেকে বেরিয়ে সাধারণ, নিম্নবিত্ত, অসচেতন মানুষের স্বার্থে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নাট্য প্রয়োগের যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে। উন্নয়ন নাট্যের ক্ষেত্রে ফরাসি নাট্যকার রম্যাঁ রলাঁ, ব্রাজিলের পাওলো ফ্রেইরে বা অগাস্তো বোয়ালের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।'

করোনা স্কোয়াড এক এর সমন্বয়ক ও করোনাট্যের অভিনেতা সনাতন কর্মকার বলেন, 'করোনা স্কোয়াড এর সাথে মানুষের জন্য কাজ করে জীবনকে ভিন্নভাবে চিনতে পারছি, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মতো আনন্দের কিছু আর নেই, সবার সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে যেতে চাই।'

প্রথম দিকে ব্যক্তি উদ্যোগে কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে  চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষিতে স্থানীয় কিছু সামর্থ্যবান মানুষ সাধ্যমতো আর্থিকভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন মহৎ এই কাজটির সাথে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা