kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস

মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ৭ দাবি নাসাসুর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ মে, ২০২০ ২২:৪১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ৭ দাবি নাসাসুর

বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবসে বাংলাদেশে মাসিক ব্যবস্থাপনায় ৭ দফা দাবি জানিয়েছে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফোরাম (নাসাসু)। আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক মার্জিয়া প্রভা এ দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২৮ মে সারা বিশ্বে মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে সপ্তম বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস। প্রতিটি নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মাসিক, যা নারীর প্রজনন এবং শারীরবৃত্তীয়র সংগে সম্পর্কিত। এই কথা অনস্বীকার্য যে, নিরাপদ এবং ঝামেলাবিহীন মাসিক স্বাস্থ্য নারীর মৌলিক অধিকার এবং মানবাধিকার। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় এই যে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ নারীরা মাসিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অসচেতন থাকার ফলে তাদের স্বাস্থ্য অধিকার ব্যাহত হয়। অথচ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নারীর এই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য অধিকারটি নিয়ে খুবই কম আলাপ হয়। আমরা দেখতে পারছি যে, বাজারে উচ্চমুল্যের স্যানেটারি প্যাড ও মেনস্ট্রুয়াল কাপ, অহরহ জেল প্যাডের ছড়াছড়ি, প্রান্তিক পর্যায়ে মেয়েদের কাছে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার তথ্য না পৌঁছানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে এড়িয়ে যাওয়া প্রভৃতি বাংলাদেশের নারীদের মাসিক স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণরুপে ব্যাহত করছে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে স্যানেটারি প্যাডের মুল্য হাতের নাগালে আনার কোন উদ্যোগ আমরা এখনও দেখতে পারিনি।

গত ২০১৯-২০ বাজেটে স্যানেটারি প্যাডের উপর আমদানিকৃত কাঁচামালের উপর আরোপিত মূল্য সংযোজন করকে রেয়াত করা হয়। কিন্তু ঠিকই প্যাড ক্রয়ের উপর মূল্য সংযোজন কর টিকে যায়। যার ফলে আমাদের দেশের নারী ভোক্তাদের সেই একই দামে এখনও প্যাড কিনতে হচ্ছে। কোথাও তারা এতোটুকু সুবিধা পায়নি। তাছাড়া বাজারে যেসব কোম্পানি কাঁচামাল বিদেশ থেকে প্যাড বানিয়ে উচ্চদামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে তার প্রায় প্রতিটি বিভিন্ন absorbent জেল ব্যবহার করা হয় যা পরিবেশের সাথে মেশে না। পরিবেশের সাথে যা মেশে না, তা দীর্ঘদিন নারীর শরীরে কি বিরুপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে তা অনুমেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত জেল প্যাড নারীর শরীরে ক্যান্সার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট ও মাসিকের সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা প্রদান করে এক পরিপত্র জারি করা হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মাধ্যমিক স্কুল প্রধান এই পরিপত্র সম্পর্কে জানে না। বাংলাদেশে গত বছর বাজেটের ৩০% কে বলা হচ্ছে জেন্ডার বাজেটিং অর্থাৎ প্রতিটি খাতে জেন্ডার সংবেদনশীলতা নির্মাণ করা। বিভিন্ন জেলার স্কুলগুলোর এই পরিপত্র না মেনে চলা এবং তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনোরূপ মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না রাখা এই জেন্ডার বাজেটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

একইসাথে প্রমাণ করে যে, আমাদের দেশের জেলা উপজেলা এবং গ্রাম পর্যায়ে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়কৃত বাজেটে কোনরুপ মনিটরিং করা হয় না। আমাদের রাষ্ট্রীয় বাজেটে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো খাত নেই বলে অন্য সব স্বাস্থ্য কার্যক্রমের সংগে এইটি অন্তর্গত। আর মাসিক নিয়ে দীর্ঘদিন একধরণের ট্যাবু থাকার কারণে অন্যান্য স্বাস্থ্য কার্যক্রমের মধ্যে এইটি নিয়ে সবচেয়ে কম কথা বলা হয়। তা স্বত্তেও নিরাপদ মাসিক নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটে কখনোই আলাদাভাবে কথা বলা হয়নি।

আমাদের দেশের জিডিপিতে নারীদের সমান ভূমিকা রয়েছে। কিছু কিছু শিল্প টিকে আছে নারীর একার হাত ধরে। অথচ তারা মাসিকের মত জরুরী এবং মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অবগত না। তার কারণ এই নিয়ে কখনও গ্রামে গ্রামে নারীদের সচেতন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কমিউনিটি ক্লিনিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে অথচ প্যাড না। স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরের কাছে গিয়ে নারীদের সাথে পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করছে, অথচ মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে না। কারণ সে নিজেই এসম্পর্কে প্রকৃত অভিজ্ঞ না। মাতৃত্বকে যেভাবে আমাদের সমাজে রাষ্ট্রে বরণ করা হয়, মাসিককে না। সাংস্কৃতিকগতভাবে এখনও মা হওয়ার বিষয়ে কোনো ট্যাবু না থাকলেও, মাসিক নিয়ে ট্যাবু রয়েছে। এই সাংস্কৃতিকগত পরিবর্তন এবং সকল মানুষকে সেনসেটাইজেশন শিক্ষা দেবার উদ্যোগ রাষ্ট্রকে আমরা এখনও নিতে দেখিনি। আর তাই এমতাবস্থায়, আমরা নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফোরাম (নাসাসু) থেকে দাবী জানাচ্ছি যে,

১. আসন্ন বাজেট ২০২০-২১ এ মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা খাত তৈরি করে তাতে পৃথক বরাদ্দ দিতে হবে।

২. দেশের সমগ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎপন্ন স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিবেশসম্মত স্যানেটারি প্যাডের বিনামূল্যে ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৩. বাজার থেকে সম্পূর্ণরুপে জেল প্যাডের বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে।

৪. স্যানেটারি প্যাড, মেনস্ট্রুয়াল কাপ, ট্যাম্পনসহ সমস্ত মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা পণ্যের উপর কাস্টমার ভ্যাট ট্যাক্স (পিংক ট্যাক্স) বাতিল করতে হবে এবং দাম হাতের নাগালে আনতে হবে।

৫. ভারী শিল্পে যেসব নারীরা কাজ করে, তাদের মাসিকের সময় ছুটি দিতে হবে।

৬. গ্রামে গ্রামে নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

৭. করোনাকালীনসহ যেকোনো সরকারি ত্রাণে এবং রেশনে স্যানেটারি প্যাড কিংবা অন্যান্য মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা পণ্যসমূহ অন্তর্গত করতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা