kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

ডিআইজি-এসপিসহ আক্রান্ত বেড়ে প্রায় চার হাজার

ভয়কে জয় করে অসহায়দের দুয়ারে দুয়ারে ‘যোদ্ধা’ পুলিশ

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৩ মে, ২০২০ ২৩:২৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভয়কে জয় করে অসহায়দের দুয়ারে দুয়ারে ‘যোদ্ধা’ পুলিশ

‘এরই মধ্যে ১২ জন সহকর্মী হারিয়েছি। ঊর্ধ্বতন স্যারসহ মাঠ পর্যায়ে সহকর্মীরা প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন। তবু ভয় পাই না। মানুষের সেবা দিয়ে চলেছি। প্রতিদিন খাবার, ঈদসামগ্রী নিয়ে মানুষে দুয়ারে যাচ্ছি।’ আজ সন্ধ্যায় এভাবেই বলছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের এসআই মনসুর হোসেন মানিক।

মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে জনগণকে নিরাপদ রাখতে এভাবে সম্ভাব্য সবকিছু করছে সম্মুখ যোদ্ধা পুলিশের অকুতোভয় সদস্যরা। আর মানুষকে বাঁচাতে নিজেরাও আক্রান্ত হয়েছেন ব্যাপকভাবে। আজ শনিবার পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত পুলিশের তিন হাজার পাঁচশ ৭৪ জন সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে ১ হাজার ১২ জনই ডিআইজি-এসপিসহ পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন বলে পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। 

পুলিশ সদরদপ্তর জানায়, পুলিশের মোট আক্রান্তের মধ্যে এ পর্যন্ত সাতশ ২২ জন সদস্য করোনাকে জয় করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আর করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন।

সূত্র জানায়, করোনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার একজন, পুলিশ সুপার পদমর্যাদার আট জন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১৯ জন, সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ২০ জন, পরিদর্শক পদমর্যাদার ৯৭ জন, উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার তিনশ ৮৬ জন, সহকারী উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার চারশ ৮১ জন কর্মকর্তাসহ মোট ৩ হাজার পাঁচশ ৭৪ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা সংক্রমণ ও ঝুঁকি কমাতে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. বেনজীর আহমেদের নির্দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এরই মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের পাশে থেকে সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতাল ভাড়া করাসহ সকল পুলিশ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি সংযোজন করা হয়েছে। মূলত এ কারণে একদিকে যেমন পুলিশ আক্রান্তের হার কমছে, তেমনি দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে সুস্থতার হারও। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার শাহ মিজান শাফিউর রহমানকে প্রধান করে এরই মধ্যে গঠিত হয়েছ একটি বিশেষ টিম। করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত সশরীরে দেখতে হাসপাতালে ছুটে চলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিচ্ছেন।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ কেন এত বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে তার অন্যতম কারণ অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শুরু থেকে। আনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজেই নয়, করোনা আক্রান্ত মানুষের লাশ দাফন, হাসপাতালে রোগী ভর্তি করাসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তা নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। সারা দেশেই পুলিশ খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। অনেকের কাছে ঈদ উপহারও পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে মানুষের প্রশংসাও পাচ্ছেন। সম্মিলিতভাবে এমনকি ব্যক্তি উদ্যোগেও পুলিশের অনেক সদস্য দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজ রাজধানীর গুলশান থানা এলাকায় চার হাজার করোনা দুর্গত মানুষকে ঈদ উপহার পাঠিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। 

ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে সহযোগিতা করছেন যেসব পুলিশ সদস্য ডিএমপির কলাবাগান থানার উপ-পরিদর্শক মো. মনসুর হোসেন তাদেরই একজন। নিজের বেতনের টাকায় সামর্থ্য অনুযায়ী তার থানা এলাকায় ভাসমান, ফুটপাতে খুপড়ি ঘড়ে বাস করা মানুষ ও ভবঘুরেদের মধ্যে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছেন প্রতিদিন। শুধু এসআই মানিকই নয় বংশাল থানা এলাকায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অসহায় পরিবার ও কর্মহীন মানুষকে আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে শুভেচ্ছা ঈদ উপহার দিয়ে চলেছেন বংশাল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহীন ফকির। 

বংশাল থানা এলাকায় করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির পরিবার ও আইসোলেশনে থাকা এমন ৮৫টি পরিবারকে ঈদ উপহার বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। অসহায় পরিবারদের ঈদ উপহার দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বংশাল বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ঈদের খুশি সকলের মাঝে বিলিয়ে দিতে থানার অফিসার ও ফোর্সদের ঈদের বোনাসের কিছু অংশ ও যাকাতের টাকা দিয়ে ৮৫ পরিবারের বাসায় ঈদ উপহার পৌঁছিয়ে দিয়ে এসেছি। এর আগে পুরান ঢাকার অন্তঃসত্ত্বা নারীকে এই সঙ্কটের সময় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। পরে ওই নারী সুস্থ হয়ে নবজাতক সন্তান নিয়ে বাড়ি ফেরার পর মা ও শিশু সন্তানকে উপহারও পাঠিয়েছি। এছাড়াও থানা এলাকায় ফুটপাতে অসহায় মানুষের মাঝে খাবার বিতরণসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখছে পুলিশ। 

রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, আক্রান্তের পাশাপাশি প্রতিদিন নতুন করে অনেক সদস্য সুস্থ হচ্ছেন। হাসপাতাল ত্যাগ করার সময় বরাবরের মতোই করোনা প্রতিরোধের সম্মুখযোদ্ধাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। 

তবে সুস্থ হলেও বেড়েই চলেছে পুলিশে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সঙ্গে মৃত্যুও বাড়ছে। পুলিশের সুরক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সচেতনতার পাশাপাশি সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি জানানো হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের। বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে সিনিয়র অফিসাররা তাদের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলছেন। সুরক্ষা সামগ্রী ও পর্যাপ্ত জীবাণুনাশক সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর পরও অনেক সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন। 

আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সুচিকিৎসা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কয়েকটি টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমের কর্মকর্তাগণ সার্বক্ষণিক করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের পাশে যাচ্ছেন, তাদের সাথে কথা বলছেন, তাদের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা