kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

আসলে তিনি কে?

►শীর্ষ সন্ত্রাসী জয় আর কানাডার ব্যবসায়ী তারেক রানার অদ্ভু্ভত মিল ►তিন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খোঁজ নিচ্ছে তাঁর

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৪:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আসলে তিনি কে?

বাংলাদেশে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম রয়েছে তানভীরুল ইসলাম জয়ের। তিনি ছিলেন সন্ত্রাসীদের ‘সেভেন স্টার গ্রুপের’ সদস্য। বহু আগেই বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। তিনি ভারতে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যই আছে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। সম্প্রতি কানাডার গ্লোবাল নিউজ নামের একটি গণমাধ্যম তাঁর ছবি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে বলছে, বাংলাদেশের তানভীরুল ইসলাম জয়ের মতোই দেখতে কানাডার ব্যবসায়ী তারেক রানা, যিনি কানাডার রাজনৈতিক দলকে ডোনেশন দিচ্ছেন। এ খবরের ফলে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও কানাডার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করেছে। পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গ্লোবাল নিউজের খবরে বলা হয়েছে, বছর পাঁচেক আগে কানাডায় আসেন তারেক রানা। টরন্টোর পূর্বে একটি ডেভেলপমেন্ট কম্পানি খুলে বসেন। সেখানে একজন গ্লোবাল উদ্যোক্তা ও জনহিতৈষী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। কানাডার রাজনীতিতেও যোগাযোগ গড়ে ওঠে তাঁর। কানাডার এই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীই কি বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয়? গ্লোবাল নিউজের সাংবাদিক সু্বয়ার্ট বেল ও অ্যান্ড্রু রাসেল অনুসন্ধান চালিয়ে এ প্রশ্ন তুলেছেন।

রিপোর্টে বলা হয়, টরন্টোর ব্যবসায়ী তারেক রানা বিভিন্ন চ্যারিটি এবং রাজনীতিকদের কার্যক্রমে অর্থ সহায়তা দেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো বিভিন্ন ছবিতে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী ও মেয়রদের কার্যালয়ে দেখা যায়। ২০১৮ সালে অন্টারিও প্রদেশের অ্যাজাক্সের সেরা উদ্যোক্তাদের একজন হন তিনি। অর্জন করেছেন সুনাগরিকের সম্মাননা। স্থানীয় এক ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ৯২টি দেশ ঘুরেছি। এর মধ্যে কানাডাই সেরা।’

গ্লোবাল নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, খ্যাতির চূড়ায় ওঠা ব্যবসায়ী তারেক রানা ও সন্ত্রাসী জয়ের মধ্যে বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। পুলিশের তথ্য এবং আদালতের নথি বলছে, বাংলাদেশের সেভেন স্টার গ্রুপের নেতাকে ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেপ্তার করা হয়। কলকাতায় তিনি তারেক রানা নামে অবস্থান করছিলেন এবং যখন গ্রেপ্তার হন তখন তাঁর ওই নামই রেকর্ড করা হয়েছিল। আবার কানাডার অ্যাজাক্সের এই ব্যবসায়ীর নামও তারেক রানা। ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেপ্তারের পর ‘তারেক রানা’ নামের ওই সন্ত্রাসীর যে ছবি তোলা হয় তা প্রকাশ পেয়েছিল। ভারতীয় আদালতে মো. তারেক রানার নামে ইস্যুকৃত একটি ভারতীয় পাসপোর্টও জমা দেওয়া হয়। অ্যাজাক্স ব্যবসায়ীর জন্মতারিখ, বাবার নাম, স্ত্রীর নামের সঙ্গে সেই গ্রেপ্তারকৃত তারেক রানার পাসপোর্টের তথ্য মিলে যায়। সেই পাসপোর্টটি অ্যাজাক্সের ব্যবসায়ী রানাকে দেখালে সেটি যে তাঁরই তা তিনি স্বীকার করেন। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি তাঁর ‘পরিচয় চুরির’ মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন। ই-মেইলের মাধ্যমে গ্লোবাল নিউজকে তিনি জানান, ‘কেউ একজন আমার পাসপোর্ট এবং ছবি ব্যবহার করেছে। এ জন্য আমি সত্যিই আতঙ্কিত।’ তাঁর দাবি, তিনি স্রেফ একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী, যিনি ওয়ার্ক পারমিটের বদৌলতে কানাডায় বসবাস করছেন।

কিন্তু রানা ও মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী জয়ের মধ্যে মিলগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০০৭ সালে কলকাতায় আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্য জয়ের দুই পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। একই ঘটনা কানাডার এই ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। গ্রেপ্তারকৃত রানার ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিজনেস রেকর্ড এবং ট্যাক্স রিটার্নের তথ্য পরীক্ষা করে তাঁকে বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী জয় হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। সেখানে তাঁর জন্মতারিখ ৩ মার্চ, ১৯৬৭ লেখা আছে। অ্যাজাক্সের ব্যবসায়ীর জন্মতারিখও তাই।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি মহিউল ইসলাম গ্লোবাল নিউজকে জানান, মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের তালিকায় ছিল এই অভিযুক্ত ব্যক্তি। জয়ের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যাকাণ্ড, দুটি হত্যাচেষ্টা, ভয়ংকর অস্ত্র দিয়ে মারাত্মক জখম এবং চাঁদার জন্য শারীরিক ক্ষতির হুমকি প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কানাডার অ্যাজাক্সের অফিসে বসে ব্যবসায়ী তারেক রানা সাংবাদিকদের উল্টো প্রশ্ন করেন ‘সেভেন স্টার গ্রুপটা আসলে কী?’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জয়ই তারেক রানা কি না এমন প্রশ্ন তুলে গত ৪ ডিসেম্বর সংবাদ প্রকাশ করে কানাডার গ্লোবাল নিউজ। একই দিন ‘মিডলইস্ট হেডলাইনস ডটকম’ নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমও ‘তারেক রানা—দ্য ক্রাইম বস অব দ্য সেভেন স্টার গ্রুপ’ শিরোনাম দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাও সংবাদ প্রকাশ করেছে। সব মিলিয়ে ওই ব্যক্তি জয় নাকি তারেক রানা তা নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ, ভারত ও কানাডার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেক রানা সন্ত্রাসী জয় কি না তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদি তিনি জয় হয়ে থাকেন তাহলে সরকারি পর্যায়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চেষ্টা করা হবে। এ বিষয়ে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, গ্লোবাল নিউজের সাংবাদিক কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের পুলিশের সহযোগিতা কামনা করেন। পরে পুলিশের তরফ থেকে তাঁকে সহযোগিতা করা হয়। এ দেশের পুলিশের দেওয়া তথ্যর সঙ্গে তারেক রানার তথ্য মিলে যাওয়ার কারণে জোরালো সন্দেহ হচ্ছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী জয়ই কানাডার তারেক রানা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা