kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

মাইয়াটা কইলো মা আমারে বাঁচাও!

জহিরুল ইসলাম   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ১৯:২৫ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মাইয়াটা কইলো মা আমারে বাঁচাও!

ছবি : কালের কণ্ঠ

'ক্যামনে কি হইলো কিছুই বুঝলাম না! সবাই মিলা এক সঙ্গে গেলাম আর এখন মাইয়াটা নাই হইয়া গেলো। আর অন্য সবাই হাসপাতালে কাতরাইতেছে। ১২টার দিকে সবাই ট্রেনে (উদয়ন) উঠলাম। এরপর সবাই গল্প করতে করতে অনেকে ঘুমাইয়া পড়ে। আমরা চুপচাপ বইসা রইছি। রাইত তিনটার দিকে ট্রেনে একটা ধাক্কা লাগলো এরপর সব অন্ধকার। খালি চিল্লাচিল্লির আওয়াজ আর রক্ত আর রক্ত। আমি খালি পোলা মাইয়া গুলারে খুঁজতেছিলাম। পরে পাইলাম কিন্তু মাইয়াটা আধা মরা! কইলো মা আমারে বাঁচাও। এরপর আর কিচ্ছু মনে নাই। কারে কই নিয়া গেলো।'

আজ বুধবার বিকেল তিনটায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু হাসপাতাল) বেডে শুয়ে বিলাপ করতে করতে অগোছালোভাবে কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ফারজানা আক্তারের (১৬) মা রোজিনা বেগম (৪৫)।

ঘটনার দুদিন আগে সিলেট শ্রীমঙ্গলে খালাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলো ফারজানা আক্তার (১৫)। সঙ্গে পরিবারের আরও আট সদস্য। এক সঙ্গে গেলেও তাদের সঙ্গে আর ফেরা হয়নি চাঁদপুর বাগাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর (এসএসসি পরীক্ষার্থী)। চাঁদপুরের উত্তর বানিয়া ইউনিয়নের বানিয়া গ্রামে ফিরেছে তার নিথর দেহ।

সাইন্স নিয়ে পড়ছিলো ফারজানা। মা বাবার সঙ্গে নিজের স্বপ্নের মিল রেখে হতে চেয়েছিলো ডাক্তার। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় হঠাৎ ঝড়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও পেল না। মারা গেল ঘটনাস্থলেই। কসবায় মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ জনের একজন ফারজানা। একই বগিতে ছিলো তার মা রোজিনা বেগম (৪৫), মামি শাহিদা আক্তার (৪৫), বড় ভাই হাসান ব্যাপারী (২৫), মামাতো বোন মিতু আক্তার (২৩) নানি ফিরোজা বেগম (৬৫), মামাতো বোন ইমলি (৪), বোনের ছেলে জোবায়ের (৩)। আহত পাঁচজনকে পঙ্গুতে ভর্তি করানো হয়েছে। একজন চিকিৎসা নিচ্ছে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে। জোবায়ের চাঁদপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে আর ইমলী সুস্থ আছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, অনেকটা নিথর হয়ে আছে মিতু। মুখে আঘাতের চিহ্ন, বাম হাত-পা ভাঙ্গা মোট কথা শরীরের বাম পাশটা থেতলে এখন নিশ্চুপ। জরুই বিভাগের সিনিয়র স্টাপ নার্স জসিম উদ্দিন বলেন, মেয়েটার শরীরের একপাশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও কথা বলতে পারে না। ঠিক হতে সময় লাগবে।

শ্রীমঙ্গল থেকে চট্টগ্রামগামি উদয়ন এক্সপ্রেসে উঠেছিলো তারা। উদ্দেশ্য কুমিল্লায় নেমে সেখান থেকে চাঁদপুর যাওয়া। মাত্র ২০ মিনিট পরে নামতে পারতো কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে। তবে এর আগেই ঘটে যায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা। 

নিহত ফারজানার মা রোজিনা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, আর আধা ঘণ্টা ২০ মিনিট পর আমরা কুমিল্লা নাইমা যাইতাম। কিন্তু হঠাৎ এমনটা হইলো। ঘটনার পর দেখলাম মাইয়াটারে কম্বল দিয়া মোড়াইয়া রাখছে কম্বল রক্তে ভিইজ্জা গেছে। কাতরাইতে কাতরাইতে সে কইছিলো মা আমি কি বাঁচমু না?

গত মঙ্গলবার ভোররাত পৌনে ৩টার দিকে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে ১৬ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা