kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়িতে অভিযান

দুই দফা রিমান্ডেও মামলায় নেই অগ্রগতি

ক্যাসিনো কারবার পড়েছে ধামাচাপা

এস এম আজাদ   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০২:৫০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুই দফা রিমান্ডেও মামলায় নেই অগ্রগতি

আজিজ মোহাম্মদ ভাই। ফাইল ছবি

বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের গুলশানের বাড়িতে অভিযানের সময় অবৈধ মদের বার এবং ক্যাসিনো কারবার চালানোর আলামত পাওয়া গেলেও মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রায় এক মাসেও গ্রেপ্তার করা যায়নি অবৈধ কারবারের নিয়ন্ত্রক, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের দুই ভাতিজাকে। আদালতের নির্দেশে বাড়ির দুই কেয়ারটেকার নবীন মন্ডল ও পারভেজকে দুই দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। প্রাথমিক তদন্তেই আজিজ মোহাম্মদের দুই ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ ভাই ও আহাদ মোহাম্মদ ভাই বাড়িতে অবৈধ কারবার চালাতেন বলে তথ্য মেলে। বর্তমানে অগ্রগতির ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো কিছু তথ্য নিয়ে তারা যাচাই করছেন।

এদিকে গুলশানের ওই বাড়ি থেকে ক্যাসিনো কার্ড ও এএমবি লেখা এক হাজার ৬০০ কয়েন উদ্ধারের ঘটনায় সাধারন ডায়রি (জিডি) করার কথা বলা হলেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কোনো জিডি বা মামলা হয়নি। মাদক মামলায়ই ক্যাসিনো সামগ্রী জব্দ দেখানো হয়েছে। এখন ডিএনসি ও পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন- ‘কিভাবে ক্যাসিনো চালাতো সে বিষয়ে কোন তদন্ত হচ্ছে না।’ এতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারখ্যাত আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়ির ক্যাসিনো কারবার ধামাচাপা পড়ছে। অথচ চলমান অভিযানে ক্যাসিনো সামগ্রী পাওয়ার প্রতিটি ঘটনারই তদন্ত হচ্ছে।

ডিএনসির সহকারী পরিচালক (ঢাকা উত্তর) খোরশিদ আলম জানান, প্রথম দফায় কেয়ারটেকার নবীন ও পারভেজের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিজ্ঞ মহানগর হাকিম আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৪ নভেম্বর ওই রিমান্ডে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়নি। ৫ নভেম্বর ফের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে বিজ্ঞ আদালত তিন দিনের মঞ্জুর করেন। ১০ নভেম্বর তিন দিনের রিমান্ড শেষে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দেয়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক ইব্রাহিম খান বলেন, এই মামলায় তেমন অগ্রগতি নেই। নতুন কোনো অভিযান ও জব্দ নেই। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে যেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্যাসিনোর সামগ্রী এই মামলার বিষয় না। ওমর মোহাম্মদ বা অন্যদের অবস্থান এখনো জানা যায়নি।’

জানতে চাইলে ডিএনসির উপ-পরিচলক (ঢাকা মেট্রো) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ‘ক্যাসিনোর সামগ্রীগুলোর তদন্ত আমাদের আইনের আওতায় পড়ে না। পুলিশ বা র‍্যাব চাইলে নিজ উদ্যোগে তদন্ত করতে পারে। আমরা একটি ফরোয়াডিং দিয়ে এগুলো জমা দিয়েছি।’

গুলশান থানার ওসি এম এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দুটি মামলা করেছে, যেগুলো তারাই তদন্ত করছে। এ ছাড়া ক্যাসিনোর ব্যাপারে কোনো জিডি বা মামলা হয়নি। এগুলো তাদের মামলার আলামত। আদালতের নির্দেশনায় তারাই হয়ত ধংস করবে!’ কারা জড়িত তেমন কোনো তদন্ত, এমন প্রশ্ন করা হলে ওসি বলেন, ‘এটা তো আমরা বলতে পারব না।’

গত ২৭ অক্টোবর গুলশানের ৫৭ নাম্বার সড়কের ১১/এ হোল্ডিংয়ের দুটি ছয় তলা ভবনে অভিযান চালিয়ে ৩৯০ বোতল মদ, চার কেজি সিস, দুই গ্রাম গাঁজা, একটি ক্যাসিনো কার্ড, এক হাজার ৬০০ ক্যাসিনো কয়েন জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় আজিজের ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ, গ্রেপ্তারকৃত কর্মচারী নবীন ও পারভেজকে আসামি করে দুটি মামলা করা হয়। অভিযানের সময় ফায়ার এক্সিট দিয়ে পালিয়ে যান ওমর মোহাম্মদ।

একটি মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গুলশানের ৫৭ নাম্বার সড়কের ১১/এ হোল্ডিংয়ের ছয় তলা বাড়ির তৃতীয় তলায় ওমর মোহাম্মদ তার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে ও ছাদে মাদকদ্রব্য মজুদের জন্য বিশেষ কারুকার্যকরে ঘর তৈরি করেন। অপর এজাহারে বলা হয়েছে, ছয় তলা বাড়ির চতুর্থ তলার উত্তর-পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে বিপুল পরিমাণে মদ রেখে বিক্রি করছিলেন নবীন মন্ডল ও পারভেজ। চতুর্থ তলার উত্তর-পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাট থেকে ৩৭২ বোতল বিদেশি মদ, একটি ক্যাসিনো কার্ড এবং এএমবি নামাঙ্কিত এক হাজার ৬০০ ক্যাসিনো কয়েন জব্দ করা হয়।

একাধিক সূত্র জানায়, এএমবি হচ্ছে আজিজ মোহাম্মদ ভাই বা তার ভাতিজা আহাদ মোহাম্মদ ভাইয়ের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। আজিজের ভাই রাজা মোহাম্মদের ছেলে আহাদ বাড়িতে ক্যাসিনোর আসর বসাতেন। সেখানে ডলারে জুয়া খেলা হতো। আর কর্মচারীদের দিয়ে মদ বিক্রি করতেন আহাদের ভাই ওমর মোহাম্মদ। তাদের বাড়িতে যেতেন আজিজ মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ বিত্তবান অনেক ব্যক্তি। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সালমান শাহের মৃত্যু এবং মাদক কারবারে সমালোচিত হন অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আজিজ। অর্ধশত চলচ্চিত্রের প্রযোজক আজিজ শেয়ার বাজার থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মামলায় পলাতক হলেও অনেক বছর থাইল্যান্ডে আছেন। সেখানে তার হোটেল ও ক্যাসিনো ব্যবসা আছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকার ১১টি ক্লাবসহ ৪৯ অভিযানে ২৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে আট কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩২টি চেক বই, ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক, আট কেজি সোনা, ২০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বিপুল পরিমাণ মদ বিয়ার ও ইয়াবা জব্দ হয়। ১১টি মামলার তদন্ত পায় র‍্যাব, যার মধ্যে তিনটি মামলার চার্জশিটও দিয়েছে। বাকি মামলাগুলো থানা পুলিশ, সিআইডি এবং গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা