kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভোলায় সংঘর্ষ

মাথা থেঁতলানো ছিল দুজনের

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ১৭:৫৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাথা থেঁতলানো ছিল দুজনের

ছবি : কালের কণ্ঠ

ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারকে কেন্দ্র করে ভোলার বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সাথে এলাকাবাসীর সংঘর্ষে যে চারজন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজনের মাথা ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে থেঁতলানো ছিল বলে চিকিৎসকের বরাতে জানিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।

পুলিশ সদরদপ্তরের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরে বুধবার দুই ঘণ্টা ধরে চলা হামলা-সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, তাতে এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।  

এক তরুণের ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয় গত শুক্রবার। এরপর সেই আইডির মেসেঞ্জারে ‘ধর্ম অবমাননাকর’ কথাবার্তা চালানো হয়। সেই কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া হলে সেটি ভাইরাল হয়। এরপর ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ডাক দেওয়া হয় বিক্ষোভ সমাবেশের। ওই তরুণ শুক্রবারেই থানায় গিয়ে তাঁর ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানান। পুলিশ এ নিয়ে ঝামেলা হওয়ার বিষয়টি আঁচ করে তরুণকে নিজেদের হেফাজতে রেখে তাঁকে সঙ্গে নিয়েই অভিযান চালিয়ে হ্যাকারদের ধরে ফেলে। পাশাপাশি আলেম-উলামাদের নিয়ে প্রশাসন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। আইডি হ্যাক করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্ম অবমাননার প্রচারণার বিষয়টি অবগত হয়ে উলামারা গতকাল রবিবারের কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেন।

কিন্তু এর পরও একদল তরুণের লিফলেট ও মাইকে প্রচারণা চালানোর কারণে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ঈদগাহ মাঠে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এতে চারজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক। অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আহতদের অনেককে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) ও ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নিহতরা হলো বোরহানউদ্দিন উপজেলার মহিউদ্দিন পাটওয়ারীর মাদরাসাপড়ুয়া ছেলে মাহবুব (১৪), উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দেলওয়ার হোসেনের কলেজপড়ুয়া ছেলে শাহিন (২৩), বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহফুজ (৪৫) ও মনপুরা হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা মিজান (৪০)।

এ ঘটনায় বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে পুলিশ। সদরপ্তর, এসবি, পিবিআই ও জেলা পুলিশের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত ওই কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

জনমনে বিভ্রান্তি এড়াতে পুলিশ সদরদপ্তর বোরহানউদ্দিনের ঘটনার একটি বিবরণ তুলে ধরেছে তাদের বিবৃতিতে।

সেখানে বলা হয়, ১৮ অক্টোবর রাতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামের ২৫ বছর বয়সী এক যুবক বোরহান উদ্দিন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন্। তিনি জানান, তার ফেসবুক আইডি ‘বিপ্লব চন্দ্র শুভ’ হ্যাক করা হয়েছে।

জিডি করার সময় থানায় থাকাকালেই তার মোবাইলে একটি ফোন আসে এবং তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। বিষয়টি তিনি ওসিকে জানান এবং ওসি জানান ভোলার পুলিশ সুপারকে।

প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সেদিন রাতের মধ্যেই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যর ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাককারী ও তার মোবাইলে কলকারী শরীফ এবং ইমন নামে দুই যুবককে যথাক্রমে পটুয়াখালী এবং বোরহানউদ্দিন থেকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে বোরহান উদ্দিন থানায় নেওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, শুভর ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে কথিত মন্তব্যের জেরে এলাকার মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হতে থাকে। মন্তব্যকারীর ফাঁসি দাবি করেন স্থানীয় আলেম সমাজ। রবিবার বেলা ১১টায় বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে তারা প্রতিবাদ সভা করার ঘোষণা দেন।

কিন্তু জেলা প্রশাসক, ইউএনও, থানার ওসি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আলেম সমাজের প্রতিনিধিগণের উপস্থিতিতে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে শনিবার সন্ধ্যায় বোরহান উদ্দিন থানায় দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়। আলেম সমাজের অভিযোগের ভিত্তিতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যকে আটক দেখানো হয়। এ বিষয়ে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়তা পেয়ে প্রতিনিধিত্বকারী আলেম সমাজ তাদের পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচি বাতিল ঘোষণা করেন।

সদরদপ্তর বলছে, সমাবেশ বাতিলের ঘোষণার পরও রোববার সকাল থেকে কিছু লোক ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হতে থাকে। ময়দানের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানোর জন্য ১৭টি মাইক আনা হয়।

ইতোমধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এবং যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা দিতে সকালেই বরিশাল থেকে রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ভোলায় আসেন। অতিরিক্ত ডিআইজি ও ইউএনওকে নিয়ে পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন।

ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করে প্রয়োজনীয় সকল আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে তাদেরকে বার বার আশ্বস্ত করেন। তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে সমবেত লোকজন ঈদগাহ্ ময়দান ত্যাগ করেন।

সদর দপ্তর বলছে, বক্তব্য শেষে পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশ কর্মকর্তারা ঈদগাহ সংলগ্ন মসজিদ-মাদ্রাসার একটি কক্ষে অবস্থান নেন। এরই মধ্যে ‘অন্য একটি গ্রুপ’ ঈদগাহ ময়দানে ঢুকে সাধারণ মানুষকে ‘উত্তেজিত করতে থাকে'।

তারপর একদল লোক বিনা উসকানিতে মাদ্রাসার অফিস কক্ষে অবস্থানরত কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ করে। আক্রমণকারীদের একদল আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। আক্রমণকারীদের গুলিতে পুলিশের একজন মারাত্মক জখম হয়। মারাত্মক আহত হন পুলিশের আরেক সদস্য। বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজিও আহত হন।

এই পরিস্থিতিতে ইউএনও ও নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ উত্তেজিত লোকজনকে নিবৃত্ত করতে প্রথমে টিয়ার শেল এবং পরে শটগানের গুলি ছোড়ে।

সার্বিক ঘটনা পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, পুলিশ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে শুরু থেকে তৎপর থাকা সত্ত্বেও এবং আলেম সমাজ পুলিশ কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে কর্মসূচি স্থগিত করলেও, কোনো একটি স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মকে পুঁজি করে একটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অপপ্রয়াস চালিয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলসহ সারাদেশে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না করতে এবং কোনো অবস্থাতেই ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে পুলিশের বিবৃতিতে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা