kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কোটি টাকা ছিনতাইয়ে ১৫ জনের দল হাতেনাতে ধরা

ভাড়া গাড়ি নিয়ে শহরে ঘুরে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই করে ওরা

এস এম আজাদ    

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ২১:৪০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভাড়া গাড়ি নিয়ে শহরে ঘুরে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই করে ওরা

ব্যাংকের ভেতরে নজর রাখে দু’জন। কোন গ্রহক বেশি অংকের টাকা তুললে বাইরে থাকা মোটরসাইকেলের দলকে সে খবর দেয় তারা। ভেতরের দলের তথ্যে টাকা তুলে বের হওয়া ব্যক্তিদের চিনে নেয় মোটরসাইলে অপেক্ষমান দুজন। এরপর শুরু করে অনুসরণ। দূরে মাইক্রোবাসে অপেক্ষায় থাকে ‘অপারেশন দল’। মোটরসাইকেল দল টাকা বহনকারীর গতিবিধি গাড়ির দলকে জানিয়ে দেয়। এরপর গাড়ি এসে সুবিধাজনক স্থানে রাস্তা আটকে দাঁড়ায়। ওয়াকিটকি হাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জ্যাকেট পড়ার ব্যক্তিরা গাড়ি থেকে নেমে শুরু করে টাকার গাড়িতে তল্লাশি। বাধার মুখে পড়লে মারধর করে টাকা ও বহনকারীকে নিজেদের গাড়িতে তুলে সটকে পড়ে। 

এভাবেই ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ঢাকা শহরে টাকা ছিনতাই করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ১৫ সদস্যের দলটি গত ১০ অক্টোবর গুলিস্থানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দু’টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় কোটি টাকা লুট করে। পালানোর সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে সোহাগ মাঝি (২৫) নামে দলের এক সদস্য। ডাকাতির মামলায় চারদিনের রিমান্ড শেষে গতকাল বুধবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে সে। সোহাগের জবানবন্দীতে টাকা লুটের ঘটনার অধ্যপান্ত বেরিয়ে এসেছে। 
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, টাকার হিসাবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ছিনতাই বা টাকা লুটের ঘটনা এটি। সোহাগ মাঝিকে গ্রেপ্তারের সময় তাদের ব্যবহূত মাইক্রোবাস, ভুক্তভুগীদের মাইক্রোবাস, ডিবি পুলিশের ব্যবহূত জিনিসপত্র এবং একটি ব্যাগে ২৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। মোট ৯৫ লাখ টাকার মধ্যে ৬৯ লাখ ১১ হাজার টাকা এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী। পুলিশ গত ১২ অক্টোবর উত্তরা এলাকা থেকে সোহাগ বিশ্বাস (২৫) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যে ছিল লুটে ব্যবহূত গাড়ির চালক। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের নির্দেশে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দুই সোহাগ জানিয়েছে, জাকির নামে একজন ডিবি পরিচয়ে ছিনতাইকারীদের প্রধান। তিন ভাগে ভাগ হয়ে ১৫ জন এই টাকা লুট করতে যায়।

পল্টন মডেল থানার ওসি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ঘটনার পরদিনই আব্দুল হান্নান নামে এক ব্যবসায়ী বাদি হয়ে মামলা করেছেন। বেশি সংখ্যাক লোক গাড়ি থেকে টাকা লুট করায় এটি ডাকাতির ধারায় মামলা হয়েছে। দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর পুরো তথ্য জানা গেছে। টাকা উদ্ধার ও অপর আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি আমরা।

সূত্র জানায়, মামলা এজাহারে সোহাগ মাঝি ছাড়াও পলাতক হিসেবে খোকন (৩০), ফারুক (৩৫), শাহীন (৩৫) ও টয়োটা সুপারজেল মাইক্রোবাস গাড়ির অজ্ঞাত চালককে আসামি করা হয়। ছিনতাইকারীদের ব্যবহূত এই গাড়িটির নাম্বার ঢাকা মেট্টো চ ১৫-৪৫৩৩। কেরানীগঞ্জের তাওয়াল পট্টির শাহ আলমের বাড়ির মেসে থাকতেন সোহাগ মাঝি। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর পাজাখালীতে। তার বাবার নাম রফিজ উদ্দিন। খোকনের বাড়িও পটুয়াখালীর বাউফলে।

তদন্তকারীরা জানান, গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয় সোহাগ মাঝি। সে জানিয়েছে, দুইজন ব্যাকের ভেতরে থেকে বাইরে বেশি টাকা তোলা ব্যাক্তিদের ব্যাপারে তথ্য দেয়। বাইরে থেকে মোটরসাইকেলে আরো দুজন অনুসরণ করে। আর যে মাইক্রোবাসে পথরোধ করে টাকা লুট করা হয় সেখানে ছিল ১১ জন। এই দলের নেতৃত্ব দেওয়া জাকির এক মাস আগে উত্তরা থেকে মাইক্রোবাস মাসিক হিসাবে ভাড়া নেয়। এভাবে তারা সারাদিন শহরে ঘুরে বেড়ায় এবং ব্যাংক থেকে রাস্তায় ওত্ পেতে থেকে ডিবি পরিচয়ে টাকা লুট করে। 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এসআই মাসুদ রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, সোহাগ মাঝিও পেশাদার অপরাধী। তার বিরুদ্ধে আগে দুটি মামলা আছে। জাকিরসহ দলের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও মামলা আছে।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা টাকার উত্স্য খতিয়ে দেখিনি। তবে ব্যবসায়ী এরই মধ্যে আদালতে প্রমানপত্র দেখিয়ে জব্দকৃত ২৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ফেরত পেতে আবেদন করেছেন। 

মামলার বাদি ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান এজাহারে উল্লেখ করেছেন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তার বাড়ি হলেও বর্তমানে রাজারবাগ এলাকায় থাকেন। তিনি একজন ব্যবসায়ী। তার দু’টি প্রতিষ্ঠানের নাম ‘প্যানারোমা এপারেলস এ্যান্ড হোমটেক্স’ এবং ‘প্যানারোমা আইল্যান্ড লিমিটেড’। পল্টনের বক্স কালভার্ড এলাকার ৬৫/২/১ প্যারামাউনটস হাইটস ভবনের চতুর্থ তলায় এসব প্রতিষ্ঠানের অফিস। এই প্রতিষ্ঠান ‘রাজ কামাল করপোরেশন’ নামে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কৃষিজাতপণ্য রপ্তানি করে আসছে। 

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আব্দুল হান্নান বলেন, গত ১০ অক্টোবর দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নাইমুর রহমান রাব্বী (২২), মাহবুবুর রহমান (২৫) ও গাড়িচালক মকবুল হোসেন (৩৭) সাভারে একটি প্রতিষ্ঠানে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করার জন্য টাকা সংগ্রহ করতে বের হয়। তারা বিকেল ৩টার দিকে বিজয়নগর ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৬০ লাখ টাকা তুলে মাইক্রোবাসে ( ঢাকা মেট্টো চ ১৯১৫৮৬) মতিঝিলে যায়। সেখানে সোনালী ব্যাংকের ফরেন এক্সেজ শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা তোলে। এরপর পুরান ঢাকার চকবাজারে গিয়ে হাসান নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেয়। আরো দুই স্টাফকে নিয়ে তাদের সাভারে যাওয়ার কথা ছিল। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে নোয়া মাইক্রোবাসটি বঙ্গবন্ধু এভিনিউর অগ্রণী ব্যাংকের কাছে পৌঁছলে পেছন থেকে একটি টয়েটা সুপারজেল গাড়ি সামনে এসে টাকা বহনকারী গাড়িটির পথ আটকে দাঁড়ায়। ওই গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তল্লাশির জন্য দরজা খুলতে বলে। স্টাফরা দরজা না খুলতে তারা জোর করে দরজা খুলে মারধর শুরু করে। ছিনতাইকারীরা দুই ব্যাগে থাকা ৯৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের গাড়িতে চলে যায়। এসময় আব্দুল হান্নানের স্টাফরা চিত্কার দিলে বেশ কিছু পথচারী ও পুলিশ সেখানে উপস্থিত হন। তারা গাড়ি ঘিরে ফেললে ছিনতাইকারীরা দৌড়ে পালায়। তখন গাড়ি ও একটি টাকার ব্যাগসহ ছিনতাইকারী সোহাগ মাঝিকে আটক করা হয়। ওই ব্যাগে ২৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ছিল। গাড়িতে পুলিশের সিগন্যাল লাইট, ডিবি-ডিএমপি লেখা একটির জ্যাকেট, একটি বেতার যন্ত্র (ওয়াকিটকি) জব্দ করা হয়। পরে পুলিশ ভুক্তভোগীদের ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটিও জব্দ করে। 

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছিনতাইকারীদের হামলায় আব্দুল হান্নানের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী রাব্বী আহত হন। একই রকম হামলায় আহত হয়েছে ছিনতাইকারী সোহাগ মাঝি। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা