kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

৬৫ কোটির নয়নাভিরাম ভবনে ফেনসিডিল নিয়ে বসে ছেলেরা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:৩১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৬৫ কোটির নয়নাভিরাম ভবনে ফেনসিডিল নিয়ে বসে ছেলেরা

রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানার পাশে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তৈরি অট্টালিকাটি অযথা পড়ে আছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

জনগণের টাকায় প্রকল্পের পর প্রকল্প নিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা কিভাবে ছিনিমিনি খেলছেন, লুটপাট করছেন; সরকারের তথা জনগণের সম্পদ কিভাবে নষ্ট করছেন—এসব স্বচক্ষে দেখতে বেশি দূরে যেতে হলো না। রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানার পাশে নির্মাণ করা সুদৃশ্য ১২ তলা ভবনটিই সব জানান দিল। রোগীদের রক্ত, কফ, মল-মূত্রসহ সব ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম খরচে, কম সময়ে করা এবং পরীক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আড়াই বছর আগে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে; ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার জন্য। প্যাথলজি সেবা নিতে রোগীদের এখানে লম্বা লাইন থাকার কথা। কিন্তু গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেল, কোনো রোগী নেই; ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে একা। স্থানীয়রা জানালেন, দুই বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে ভবনটি।

শেরেবাংলানগরের নয়নাভিরাম ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা আশা জেগে থাকে মনে—এখানে অসহায় রোগীরা আসবে; প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাবে; কম খরচে, কম সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেয়ে চিকিৎসকের কাছে দৌড়াবে; এগুলো বড়ই সুখের কথা। কিন্তু ভবনের ভেতরে ঢুকতেই সব আশার বেলুন চুপসে গেল। দামি দামি আসবাবপত্রগুলোয় ধুলোবালির আস্তরণ। একতলা, দোতলা, তিনতলা, চারতলা পর্যন্ত ঝকঝকে তকতকে টাইলস-ফিটিংস আর দামি ফার্নিচার সাজানো; কিন্তু ধুলো-মলিন চেহারায়। ভবনের পঞ্চম তলায় গিয়ে চোখ আটকে গেল। চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, চীন থেকে কেনা ল্যাবের অব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলোর ওপর ধুলোবালি পড়ে আছে। কোটি কোটি টাকায় কেনা এসব যন্ত্রপাতি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। রোগীদের সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে না দামি এসব যন্ত্রপাতি। ভবনের প্রতিটি তলার জন্য কেনা ফার্নিচারগুলোর ওপর ধুলোবালি পড়ে এখন অনেকটা বিবর্ণ। সিটি স্ক্যানের জন্য তৈরি করা রুমে জং ধরেছে। ভবনের ভেতরে কাজের মানও অত্যন্ত নিম্নমানের। রুমের দরজাগুলো দেওয়া হয়েছে সাধারণ কাঠের। অথচ এসব দরজা দেওয়ার কথা ছিল সেগুন কাঠের। মরিচা পড়েছে ভবনের অনেক স্থানে। ভবনে মার্বেল পাথর ব্যবহারের কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। ভবনের ভেতরের এসব ১২ তলা ভবনে ওঠানামার জন্য বসানো দুটি লিফট ব্যবহারে কেউ নেই। কেমিক্যাল আনা-নেওয়ার জন্য কেনা একটি গাড়ি অফিসের সামনে অলস পড়ে রয়েছে। ভবনটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৬৫ কোটি টাকা। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক বললেন, ‘রাতের বেলায় ওই ভবনের চারপাশে মাদকের আড্ডা বসে। ওই ভবনের পাশেই হলো বস্তি। সেখানকার উঠতি ছেলেরা রাতের বেলায় ভবনের চারপাশে ফেনসিডিল নিয়ে বসে।’

রোগীদের প্যাথলজি সেবা দেওয়ার পাশাপাশি সারা দেশের সরকারি প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিগুলোর গুণগত মান ঠিক করতে সরকার ২০১০ সালে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়। ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার’ শিরোনামের প্রকল্পটি যখন অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন এর খরচ ধরা হয়েছিল ১৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন প্রতিষ্ঠা করা, কমিউনিটি ও হাসপাতাল পর্যায়ে ল্যাবরেটরি মেডিসিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব জনশক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, সারা দেশের ল্যাবরেটরিগুলোর গুণগত মান ঠিক করা। ল্যাবরেটরিগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া এবং গবেষণা করা। রোগীরা সরাসরি সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে পারবে। আবার দেশের যেকোনো জায়গা থেকে ডাক্তারদের দেওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাও সেখানে করাতে পারবে। ২০১০ সালে শুরু করে তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৩ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ৯ বছর পেরিয়ে গেছে। চার দফা মেয়াদ বাড়িয়েও এখনো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে ১৩৮ কোটি টাকার প্রকল্পের খরচ বেড়ে উন্নীত হয়েছে ১৯৪ কোটি টাকায়। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১৪৩ কোটি টাকা। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন চাইছে, প্রকল্পটির মেয়াদ পঞ্চমবারের মতো বাড়াতে। কিন্তু প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়াতে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। ২০১৬ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত পরিপত্রে বলা আছে, কোনো প্রকল্পে দুইবারের বেশি মেয়াদ বাড়ানো যাবে না। একটি প্রকল্পের এতবার মেয়াদ বাড়ানো সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী বলে মনে করে কমিশন।

(কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আরিফুর রহমানের বিশেষ প্রতিবেদন থেকে নেওয়া) 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা