kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আইএমইডি'র মধু: সচিবের প্রতিমাসে বাড়তি আয় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১৩:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আইএমইডি'র মধু: সচিবের প্রতিমাসে বাড়তি আয় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা

সরকারের উন্নয়নযজ্ঞে যাতে কোনো অপকর্ম না ঘটে, তা দেখভালের জন্য সরকারেরই বিশাল একটি সংস্থা রয়েছে, যার নাম ‘বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ’— আইএমইডি। এই সংস্থা তাহলে করছেটা কী? উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না কেন?

জবাব খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে কালের কণ্ঠ। বেরিয়ে আসে নজিরবিহীন লুটপাটের এক মহাযজ্ঞের চিত্র। সবাইকে নৈতিকতা শেখানোর এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি আজ নিজেই অনৈতিকতার পঙ্কিলে হাবুডুবু খাচ্ছে। সেখানে তারা উদ্ভাবন করেছে এক ‘অফুরন্ত মৌচাক’, যার নাম আউটসোর্সিং। আইএমইডির সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী— সবাই আজ ব্যস্ত সেই মধু লেহনে।  

আইএমইডিতে কর্মরত আছেন একজন সচিবের নেতৃত্বে প্রথম শ্রেণির ১০২ জন ও দ্বিতীয় শ্রেণির ১৮ জন কর্মকর্তা। এ বছর সরকারের এডিপির আকার দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে; প্রকল্প চলছে এক হাজার ৬০০টি। আইএমইডির একজন কর্মকর্তার মাসে তিনটি প্রকল্প পরিদর্শন ও তিন মাস পর পর প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। ‘দেশ উন্নত হচ্ছে, বাজেটে এডিপির আকার বাড়ছে, প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে; তাই বিদ্যমান জনবলে এত প্রকল্প নিয়মিত পরিদর্শন এখন আর সম্ভব হচ্ছে না’— এসব অজুহাত তুলে ২০১০ সালে আইএমইডি চালু করে আউটসোর্সিং। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে কিছু প্রকল্পের তদারকি ও মূল্যায়ন করিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল উৎসাহে। আইএমইডি ঘিরে দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলছে এই ‘আউটসোর্সিং মচ্ছব’।

১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর হওয়া জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারের একজন সচিবের মাসিক বেতন ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারিত। এর সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ৫০ শতাংশ বা ৩৯ হাজার টাকা, গাড়ি ও গাড়ি ভাতা ৫০ হাজার টাকা,  চিকিৎসা ভাতা, টেলিফোন বিল, বাবুর্চি বিলসহ একজন সচিবের মাসে মোট বেতন-ভাতা আসে দুই লাখ টাকা। এবার দেখা যাক, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গত বছর আইএমইডি সচিব কত টাকা আয় করেছেন। পদাধিকারবলে আইএমইডি সচিব আউটসোর্সিং পরিচালনার জন্য দুটি কমিটির আহ্বায়ক। একটি হলো প্রকল্প নির্বাচন ও বাজেট বিভাজন কমিটি, অন্যটি স্টিয়ারিং কমিটি। প্রকল্প নির্বাচন ও বাজেট বিভাজন কমিটিতে সচিবের বৈঠক ভাতা বা সম্মানী এক হাজার ২০০ টাকা। আইএমইডিতে মোট আটটি সেক্টর আছে। আটটি সেক্টরে আলাদা করে আটবার প্রকল্প নির্বাচন ও বাজেট বিভাজন কমিটির সভা হয়েছে। সে হিসেবে আটটি সভায় অংশ নিয়ে সচিবের আয় হয়েছে ৯ হাজার ৬০০ টাকা। স্টিয়ারিং কমিটিতে সচিবের বৈঠক ভাতা এক হাজার ৮০০ টাকা। একটি প্রকল্পে তিনটি করে স্টিয়ারিং কমিটির সভা হয়। ৪৮টি প্রকল্পে তিনটি করে স্টিয়ারিং কমিটির সভা করে সচিব বৈঠক ভাতা পেয়েছেন দুই লাখ ৫৯ হাজার ২০০ টাকা। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রকল্প মূল্যায়ন শেষে ডাকা হয় জাতীয় কর্মশালা। ৪৮টি প্রকল্পে আলাদা আলাদা কর্মশালা। প্রতি কর্মশালায় সচিবের সম্মানী ছয় হাজার টাকা। ৪৮টি জাতীয় কর্মশালায় অংশ নিয়ে সচিবের এসেছে দুই লাখ ৮৮ হাজার টাকা। বছরজুড়ে আইএমইডিতে আউটসোর্সিং করা প্রতিষ্ঠানকে যে সহায়তা দেওয়া হলো, তার জন্য প্রতিটি প্রকল্প থেকে সচিবকে সম্মানী দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা করে। এভাবে ৪৮টি প্রকল্পে ব্যবস্থাপনা সেবা সম্মানী বাবদ সচিব পেয়েছেন ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৪৮টি প্রকল্প থেকে গত বছর সচিবের আয় ছিল ১৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০ টাকা; যা গড়ে মাসে এক লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা। প্রতি মাসে আইএমইডি সচিব বেতন-ভাতা পান দুই লাখ টাকা; তার সঙ্গে শুধু আউটসোর্সিং খাত থেকে মাসে যোগ হয়েছে আরো এক লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা। ২০১০ সাল থেকে যতজন সচিব এই বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁরা সবাই এই সুবিধা পেয়েছেন; যে সুযোগ অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে নেই।

এভাবে হিসাব কষে দেখা যায়, আইএমইডির মহাপরিচালক পদের (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার) একজন কর্মকর্তা যাঁর নিয়মিত বেতন-ভাতা, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধাসহ মাসে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। তিনি গত বছর আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিয়ে বাড়তি আয় করেছেন আট লাখ টাকা অর্থাৎ মাসে ৬৬ হাজার ৬৬৬ টাকা; যুগ্ম সচিবের নিয়মিত বেতন-ভাতা মাসে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা আর আউটসোর্সিং বৈঠক থেকে আয় ৫৮ হাজার ৩৩৩ টাকা। পরিচালকের (উপসচিব) নিয়মিত বেতন-ভাতার আয় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা আর শুধু বৈঠক করে মাসে আয় আরো ৫০ হাজার টাকা। সহকারী পরিচালক পদের নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মাসে নিয়মিত বেতন-ভাতা ৪০ হাজার টাকা আর আউটসোর্সিংয়ের বৈঠক বাবদ বাড়তি পেয়েছেন মাসে আরো ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী আউটসোর্সিং খাতে গত বছর ক্ষেত্রভেদে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মতো বাড়তি আয় করেছেন।

এভাবে আইএমইডিতে কর্মরত প্রথম শ্রেণির ১০২ জন কর্মকর্তা, দ্বিতীয় শ্রেণির ১৮ জন কর্মকর্তা, তৃতীয় শ্রেণির ৬৮ ও চতুর্থ শ্রেণির ৩৯ জন কর্মচারী—মোট ২২৭ জনের সবাই আউটসোর্সিংয়ের মধু লুটছেন। প্রকল্প মূল্যায়ন করা হয় কাজ চলা অবস্থায়, আবার কাজ শেষেও। প্রতিটি প্রকল্প মূল্যায়নের কাজে আউটসোর্সিং করা প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ৩২ লাখ টাকা করে। গত বছর এক হাজার ৬০০ প্রকল্পের মধ্যে ৪৮টি প্রকল্পের মূল্যায়ন আউটসোর্সিংয়ে দেওয়া হয়েছিল; বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে আউটসোর্সিং খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২৪ কোটি টাকা আর প্রকল্প মূল্যায়নের সংখ্যাও বাড়িয়ে ৭২টি করা হচ্ছে—এ তথ্য জানালেন আইএমইডির যুগ্ম সচিব মাহমুদুল হক। সম্মানী বাবদ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে টাকা আয় করেছেন সেখান থেকে অবশ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট কাটা হয়েছে।

(কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আরিফুর রহমানের প্রতিবেদন থেকে)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা