kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড প্রাপ্তি তদন্তে দুদক

‘ভূত’ কি তাহলে ‘সরষে’র ভেতরেই?

জালিয়াত সিন্ডিকেট নির্বাচন অফিসেই!

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৬:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘ভূত’ কি তাহলে ‘সরষে’র ভেতরেই?

‘ভূত’ কি তাহলে ‘সরষে’র ভেতরেই? চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রাপ্তি নিয়ে কেলেঙ্কারির ঘটনার তদন্তে দুদকের দল নিশ্চিত হয়েছে যে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে বসেই এই অপকর্ম চালিয়েছে একটি জালিয়াতচক্র। চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তত আট থেকে ১০ জন এনআইডি কার্ড জালিয়াতি এবং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড বানিয়ে দেওয়ার কাজে জড়িত। একই সঙ্গে কার্ড জালিয়াতি ও সেই ঘটনা তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণও পেয়েছে দুদকের তদন্ত কমিটি।

গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত টানা তিন কার্যদিবস আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ও সিটি করপোরেশনের একটি কাউন্সিলর কার্যালয় অফিসে তদন্ত শেষে এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠিত তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে তাঁরা আরো বিস্তারিত তদন্তের জন্য আবেদন জানাবেন বলে জানিয়েছেন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান ও দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে রোহিঙ্গারা এনআইডি পাচ্ছে সেটা নিশ্চিত হয়েছি। এই এনআইডি কার্ড নির্বাচন অফিস থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে। কারণ এনআইডি কার্ডে যে নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে তা একদম ইউনিক, সেই নম্বর কিন্তু ভুয়া না। এটা বাহিরের কারো মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব না।’

বিস্তারিত তদন্তের অনুমোদন পেলে অন্তত চার শ থেকে পাঁচ শ রোহিঙ্গাকে নিয়ে তদন্ত করা হবে বলে জানান রতন কুমার দাশ। তিনি আরো বলেন, ‘দেখা যাবে রোহিঙ্গাদের জন্ম নিবন্ধন সনদ পেতে সমসংখ্যক মেম্বার ও চেয়ারম্যানও তদন্তের আওতায় আসবে। আশা করছি বিস্তারিত তদন্তে পুরো সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করতে পারব। পুরো ঘটনাটি একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী তদন্ত হবে।’

দুদকের তদন্তের বিষয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘যে-ই তদন্ত করুক, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এনআইডি ডাটাবেইসে কোনো রোহিঙ্গা থাকবে না। জালিয়াতির সাথে যারাই জড়িত থাকবে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ ছাড়া একজনের স্মার্টকার্ড অন্যজনকে দিয়ে দেওয়া, ভুয়া এনআইডি কার্ড ইস্যু করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আগেও চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসকেন্দ্রিক একাধিক তদন্ত কমিটি হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি কোনো সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত কিংবা কাউকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করেনি। আর নির্বাচন কমিশনের এমন অবহেলার কারণেই জালিয়াত সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করেন তদন্ত কমিটির সদস্য ও দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘যদি আগের তদন্তগুলোতে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে জালিয়াতচক্র এত বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পেত না।’

নির্বাচন অফিসকেই যেসব কারণে সন্দেহ

২০১৫ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় কিছু ল্যাপটপ উধাও হয়েছিল। গতকাল রবিবার দুদকের কাছে ল্যাপটপ হারানোর কথা স্বীকার করা হয়। এর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটি ল্যাপটপের আইডি নম্বর ৪৩৯১। প্রাথমিক তদন্তে এই ল্যাপটপ থেকেই পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত কুখ্যাত রোহিঙ্গা ডাকাত নূর আলমের স্মার্টকার্ড ইস্যু হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে দুদক। ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে লাকী আকতারসহ যে ৪৬ জন রোহিঙ্গা কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়া এনআইডি সার্ভারে তথ্য আপলোড করেছে সেই কাজও এই ল্যাপটপ থেকে হয়েছে। ওই সময় অন্তত ছয়টি ল্যাপটপ গায়েব হয়েছিল। অথচ ল্যাপটপ গায়েবের কোনো তথ্য চট্টগ্রাম নির্বাচন কার্যালয়ে নেই।

দুদক সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ বলেন, ‘নিবন্ধিত ল্যাপটপ ছাড়া এনআইডি তথ্য সার্ভারে আপলোড দেওয়া যায়। সরকারি কাজে ব্যবহৃত এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে গেছে, আর সেই রেকর্ড নির্বাচন কার্যালয়ে নেই। থানায় কোনো জিডিও করা হয়নি।’

গতকাল রবিবার দুদকের তদন্তদল চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে গেলে ৪৩৯১ নম্বর আইডির ল্যাপটপসহ ছয়টি ল্যাপটপ পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের টেকনিক্যাল অপারেটর মোস্তফা ফারুক নিয়েছেন বলে জেলা নির্বাচন অফিস থেকে তথ্য দেওয়া হয়। কিন্তু দুদকের তদন্ত কমিটি তাত্ক্ষণিক অনুসন্ধানে সেই তথ্য সঠিক নয় বলে জানতে পেরেছে। এ প্রসঙ্গে দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন অফিস এলোমেলো তথ্য দিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করছে। অফিশিয়াল ল্যাপটপ মিসিংয়ের মতো একটা মারাত্মক ইস্যু অথচ তারা জানেই না। আমরা এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার বিষয়টিও সিরিয়াসলি দেখব।’

প্রাথমিক তদন্তেই জেলা নির্বাচন অফিসের আট থেকে ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এনআইডি কার্ড জালিয়াতি ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন বলে তিনি জানান। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই নাম প্রকাশ করতে চান না।

ল্যাপটপ হারানোর বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৫ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় কিছু ল্যাপটপ মিসিং হয়েছে। কয়টি হারিয়েছে সেটা তদন্ত করে দেখতে হবে। কারণ সেই সময় আমি চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিসের দায়িত্বে ছিলাম না।’

সেই সময় চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের দায়িত্বে ছিলেন খোরশেদ আলম। বর্তমানে এনআইডি উইংয়ের পরিচালক (বাজেট) খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে এনআইডি উইং থেকে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট টেকনিক্যাল তদন্ত কমিটি গত সপ্তাহে এনআইডি কার্ড জালিয়াতির বিষয়টি তদন্ত করে গেছেন। তাই নির্বাচন কমিশনের তদন্তে ল্যাপটপ হারানোর বিষয়টি উঠে এলে অবহেলার দায় তাঁর ঘাড়েও বর্তাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা