kalerkantho

মহাপ্রতারক ডিবির হাতে ধরা

মশিউরের চেক নিয়েছেন; তো শিওর মরেছেন!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২২:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মশিউরের চেক নিয়েছেন; তো শিওর মরেছেন!

পরেন দামি পোশাক। ঘুরে বেড়ান কোটি টাকার গাড়িতে। ব্যবসায়িক আলোচনা করেন পাঁচ তারকা হোটেলে। থাকেন অভিজাত এলাকায়। তবে বাকিতে পণ্য নেওয়ার পরই পাল্টে যায় তার রুপ। চেক দিলেও মিলে না টাকা। কয়েক দিনের মধ্যে বদলে যায় অফিস। বদলে যায় বাসাও। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অভিযানে ধরা পড়েছে এমনই এক মহাপ্রতারক, যিনি এরইমধ্যে ব্যবসার নামে প্রতারণা করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। 

মশিউর রহমান খান (৪৮) নামের এই প্রতারককে মঙ্গলবার রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে জাল ডলারের মাধ্যমে প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের নির্দেশে তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিবির কর্মকর্তারা জানান, মশিউর ও তার স্ত্রী সাবরিনা রহমানসহ সহযোগিদের বিরুদ্ধে পল্টন, বনানী, গুলশানসহ কয়েকটি থানায় দুই ডজনের বেশি মামলা আছে। কয়েকটি মামলায় আদালতে তার সাজা এবং গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি হয়েছে। 

বসুন্ধরা গ্রুপ, ওয়ালটন, সিঙ্গার, বেঙ্গল গ্রুপসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির পণ্য নিয়ে সটকে পড়েছিল প্রতারক মশিউর। তাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না প্রতারণার শিকার অনেক ব্যক্তি। গ্রেপ্তারের খবরে বৃহস্পতিবার অনেক ভুক্তভোগী ডিবি কার্যালয়ে ভিড় করেছেন। নতুন অভিযোগ পাচ্ছেন তদন্তকারীরা। 

মশিউরের বাবার নাম মোতালেব আলী খান। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার গোপালপুরে। তিনি এখন গুলশানের ৪১ নম্বর সড়কের ৪৮ নম্বর বাড়িতে থাকেন। বড় ধরনের প্রতারক মশিউর গোপালগঞ্জে বাড়ি বলে সবাইকে ক্ষমতার মিথ্যা তথ্যও দেয়। 

ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফুল ইসলাম বলেন, সবুজবাগ থানায় জাল ডলারের মাধ্যমে প্রতারণার মামলায় মশিউর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার তাকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

বসুন্ধরা গ্রুপের পেপার সেক্টরের (রিকভারি সেল) এসিস্টেট এক্সিকিউটিভ শামীম শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, বায়তুল মোকাররম মার্কেটে (বায়তুল নিউ টাওয়ার) অভিজাত একটি অফিস ‘জাহান গ্রুপ’ চালাতো সে।  চলাফেরা করতো প্রাডো গাড়িতে। ব্যবসায়ীক ডিল বা মিটিংয়ের জন্য ফাইভ স্টার হোটেলে যেতো সে। ভাল ব্যবসায়ী ভেবেই তার সঙ্গে লেনদেন করে কোম্পানি। মশিউর কাগজের পণ্য কিনে ২০ লাখ টাকা এবং বসুন্ধরার সিমেন্ট কিনে আরো প্রায় ২০ লাখ টাকা বয়েকা রেখে গা ঢাকা দেয়। তার চেক প্রত্যাখাত হয়। গত দুই বছর ধরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। 

গত বছরের মার্চ মাসে পল্টন থানায় মামলা করেছেন ‘স্মার্ট পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাত্ত্বাধিকারী বখতিয়ার হোসেন। তিনি জানান, মশিউর রহমান খান, তার স্ত্রী সাবরিনা রহমান, জাহান গ্রুপের কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার রেজাউর রহমান, তাপস বড়ুয়া, ফারুক আহমেদ খান বাবু, ফারক, তুহিন, পিপ্লব, টিপু তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। ২০১৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তারা তারা বখতিয়ারের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকার লুব্রিকেট কেনে। এ লেনদেনে সাবরিনা রহমান সাক্ষরিত তিনটি ব্যাংকের চেক দেওয়া হলেও একাউন্টে টাকা না থাকলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর এদের অফিস বদলে ফেলে। 

২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর এই প্রতারকের বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করেন ফেনীর ব্যবসায়ী ইমরুল। একই বছরের ২৪ অক্টোবর গুলশান থানায় মামলা করেন বেঙ্গল গ্রুপের কর্মকর্তা নূরুল হুদা। ওই মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, বনানীর ‘আব্রার ট্রেড করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর। ওই সময় তার বাসার ঠিকানা ছিল শান্তিনগরে। প্রতিষ্ঠানের নামে ১৫০টি এলসিডি টেলিভিশন, ২০টি এলইডি টেলিভিশন, মাইক্রো ওয়েভ ওভেনসহ ৫৯ লাখ টাকার বিভিন্ন পণ্য বাকিতে নেয় মশিউর। এই লেনদেওেন চেক দিলেও তার একাউন্টে টাকা ছিল না। 

মেজর মোতাহারুল ইসলাম (অব.) নামে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, মশিউরের সঙ্গে চালের ব্যবসা করার সুবাদে দেড় বছর আগে তার পরিচয় হয়। বনানীর ১ নম্বর রোডের ২৩ নম্বর বাসায় ‘স্বপ্ন টেডিং এজেন্সি’ নামে প্রতিষ্ঠানও ছিল তার। সেখানে গেলে বলে নওগাঁর একটি বন্ধ মিলের মালিক। মিলটি চালু করার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে তার সঙ্গে শেয়ারে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেয়। পরে মোতাহারুল অর্ধেক নগদ টাকা এবং অর্ধেক ব্যাংক চেকের মাধ্যমে লেনদেনও হয়। ২০১৮ সালে জুন মাসের ১৪ তারিখে তার দেওয়া প্রথম চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। ৬৫ লাখ টাকা বাকি পড়ার পর থেকে মশিউরের আর হদিস পাচ্ছিলেন না বলে জানান মোতাহারুল। 

ভুক্তভোগী মেজর (অব.) সাকিল হোসেন খাঁন বলেন, তাকেও চাল কেনার প্রস্তাব দেয় মশিউর। একই সময় সে এলসি করার কথা বলে নগদ ৫০ লাখ টাকা ধার চায়। চলতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে ৫০ লাখ টাকা দেন সাকিল। টাকা নেওয়ার সময় মশিউর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি হিসাব নম্বরের ৫০ লাখ টাকার চেক দেয়। পরে সাকিল দেখেন ওই হিসাবে টাকাই নেই। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা