kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কন্টেইনার খুলে এবং ভাগাভাগি করে পণ্য ছাড়

বিশ্বে বিলুপ্ত পদ্ধতি এখনও সচল চট্টগ্রাম বন্দরে!

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৯:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্বে বিলুপ্ত পদ্ধতি এখনও সচল চট্টগ্রাম বন্দরে!

ফাইল ফটো

বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ভিতর কন্টেইনার খুলে কায়িক পরীক্ষা এবং আমদানি পণ্য ভাগাভাগি করে সরবরাহ নেয়ার পদ্ধতি বিশ্বের কোন সমুদ্রবন্দরে এখন চালু নেই। অথচ বিশ্বে বিলুপ্ত হওয়া পদ্ধতিতে এখনও পণ্য ছাড় হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এই পুরনো পদ্ধতির কারণে বন্দর তার নিজস্ব গতিতে এগুতে পারছে না। 

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, মোট কন্টেইনার উঠানামার ৬৮ শতাংশই এই পদ্ধতিতে ছাড় হচ্ছে। এসব পণ্য ছাড় করতে বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ভিতর প্রতিদিন ১২ হাজার মানুষ এবং ছয় হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান প্রবেশ করছে। কন্টেইনার খুলে পণ্য নামিয়ে কাস্টমসের পরীক্ষা এবং সেই পণ্য মাথায় বোঝাই করে ট্রাকে তুলতে বিপুল শ্রমিক কাজ করছে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ করতে গিয়ে বন্দরের ভিতর বিপুল স্থান তাদের দখলে থাকছে। এতে বন্দরে স্বাভাবিক কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটছে; বন্দরের ভিতর নিরাপত্তা শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বন্দরের বাইরে ভয়াবহ যানজট তৈরী হয়েছে; যা এর আগে কখনোই হয়নি। 

সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের পর আমেরিকান কোস্টগার্ডের প্রতিনিধিদল (আইএসপিএস টিম) এই অচল পদ্ধতি দ্রুত সরিয়ে নিতে আবারও তাগাদা দিয়েছে। বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একবছর আগেও তারা একই তাগাদা দিয়েছিল কিন্তু সুফল মিলেনি। 

কেন সম্ভব হচ্ছে না জানতে চাইলে বন্দর পরিচালক পরিবহন এনামুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্দরের মুল কাজই হচ্ছে পণ্য উঠানামা এবং ডেলিভারি দেয়া। কন্টেইনার খুলে পণ্য ডেলিভারি প্রথা সচল নেই বিশ্বের কোথাও; ভারতের কোন বন্দরেও নেই, দুভার্গ্যবশত কেবল আমরাই চালু রেখেছি।  বন্দরের সংরক্ষিত এলাকা থেকে এই কাজটি সরিয়ে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপো এবং আমদানিকারকের চত্বরে নেয়ার সিদ্ধান্ত দিলেই মুক্তি মিলে। পণ্য কোথায় নিয়ে ছাড় হবে সেই এখতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের। ফলে সিদ্ধান্ত তাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।’

বন্দর পরিবহন বিভাগের চৌকস অফিসার এনামুল করিম বলছেন, আমি হিসাব করে দেখেছি এই ৬৮ শতাংশ কন্টেইনার বন্দর থেকে সরবরাহ নিতে দিনে ছয় হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্দরে প্রবেশ করে। বন্দরের প্রত্যেক বর্গমিটার এই মুহূর্তে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এসব ট্রাক-কাভার্ডভ্যান বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ৬০ হাজার বর্গমিটার স্থান দখল করে রাখছে প্রতিদিন। গাড়ির সাথে প্রবেশ করে চালক-সহকারী এবং এসব পণ্য বোঝাই-নামানোর কাজে বিপুল নিয়োজিত শ্রমিক।

তিনি মনে করেন, বন্দরের ভিতর থেকে এই পুরনো পদ্ধতি সরাতে পারলে বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করেই চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি তিন থেকে চার লাখ একক কন্টেইনার উঠানামা করা সম্ভব। আর বিদ্যমান অবস্থায় আগামী দুই বছর এভাবেই বন্দরের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে। 

বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মোট আমদানি কন্টেইনারের ২০ শতাংশ জাহাজ থেকে নামিয়ে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হয়। ৮ শতাংশ ছাড় করা হয় অনসেসিস বা আমদানিকারকের চত্বরে নিয়ে গিয়ে এবং ৪ শতাংশ ছাড় করা হয় এলসিএল কন্টেইনার। বাকি ৬৮ শতাংশ ছাড় করা হয় বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ভিতর ইয়ার্ডে। এসব কন্টেইনারে একজন আমদানিকারক (এফসিএল) এর পণ্য থাকে। ফলে সেগুলো বন্দরে খোলার প্রয়োজন পড়ে না। 

তাহলে কন্টেইনার খোলার প্রয়োজন পড়ে কেন? জানতে চাইলে জেটিতে কর্মরত কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমদানি পণ্য রাখার দায়িত্ব হচ্ছে বন্দরের, আর সেই পণ্য ঘোষণামতো সঠিক আছে কিনা যাচাই করা এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করার দায়িত্ব হচ্ছে কাস্টমসের। আমরা এখন সেই কাজটি করছি বন্দর এবং বন্দরের বাইরে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে।’

তিনি বলেন, এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি নির্দেশ দেয় সব ধরনের আমদানি পণ্য বেসরকারী কন্টেইনার ডিপো বা বে টার্মিনালে নিয়ে খালাস করতে হবে; কাস্টমস সেখানে একই দায়িত্ব পালন করবে। তবে আমদানিকারকের চত্বরে গিয়ে পণ্য যাচাই করা খুবই অসম্ভব বিষয়।

তিনি পরামর্শ দেন, উন্নত দেশগুলোতে বন্দরে ভিতর কন্টেইনার খুলে পণ্য খালাসের পদ্ধতি চালু নেই। আমরাও চাই বন্দরের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই ধরনের পদ্ধতি বন্ধ হোক। এজন্য সরকারের নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত আসতে হবে। 

বন্দর কর্মকর্তারা মনে করছেন, কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্নবিশ্বাসের ঘাটতির কারণেই এই পদ্ধতি এখনো চালু রেখেছে রাজস্ব বোর্ড। পাশ্ববর্তী ভারতে এই পদ্ধতি অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হলেও চট্টগ্রাম বন্দরে রয়ে গেছে। 
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদ্ধতি বন্ধ করার সুযোগ নেই: কারণ দেশের সব ব্যবসায়ীরা তো রাতারাতি সাধু বা ভালো হয়ে যায়নি। এই পদ্ধতি বন্দরের ভিতর থেকে স্থানান্তর করে বেসরকারী ডিপোতে নেয়া যায়। এজন্য বর্তমান ডিপোর সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ বর্তামেন থাকা ১৮টি কন্টেইনার ডিপোতে সেই বিশাল কাজ করা সম্ভব নয়। 

বছরের পর বছর এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই একটি সমাধান বের করতে চাইছে। সেটি হচ্ছে বন্দরের বাইরে পতেঙ্গা উপকূলজুড়ে নির্মান পরিকল্পনায় থাকা বে টার্মিনালে এসব পণ্য নিয়ে গিয়ে ছাড় দেয়া। কিন্তু সেই বহুল কাঙ্খিত ‘বে টার্মিনাল’ এ ইয়ার্ড নির্মান কাজ এখনো শুরু হয়নি।

কবে পণ্য ডেলিভারি বে টার্মিনালে সরিয়ে নেয়া হবে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, খুব শিগগিরই এবিষয়ে 

জাহাজ থেকে কন্টেইনার নামিয়ে তিনদিনের মধ্যে ছাড় না নিলে নির্ধারিত মাসুল গুনতে হয় পণ্য আমদানিকারকদের। বিদ্যমান পদ্ধতিতে খুব কম সংখ্যক পণ্য চালানই তিনদিনের মধ্যে বিনা মাসুলে ছাড় নিতে পারেন আমদানিকারকরা। বাড়তি দিন বন্দরে থাকার ফলে বাড়তি মাসুল যোগ; এতে পণ্যের দামও বেড়ে যায়।

চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক গোলাম রাব্বানি চৌধুরী রিগ্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই বলে আসছি বন্দরের ভিতর থেকে এই পদ্ধতি সরিয়ে বন্দরের বাইরে নিতে। এতে বন্দরের ওপর চাপ কমবে; বন্দরের কাজের গতি বাড়বে। বন্দরকেন্দ্রিক ভয়াবহ যানজটও কমবে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেটি করা হচ্ছে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা