kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

লাখ টাকায় রোহিঙ্গাদের হাতে পাসপোর্ট! অর্থ, এনআইডি ভূতে জোগায়?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২২:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাখ টাকায় রোহিঙ্গাদের হাতে পাসপোর্ট! অর্থ, এনআইডি ভূতে জোগায়?

লাখ টাকা খরচ করলেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট মিলছে রোহিঙ্গাদের। আর তাদের সহায়তা করছে বাংলাদেশেরই দালালচক্র। এখন সফটওয়্যারের সঙ্গে ইন্টারভিউ মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের সনাক্ত করার কাজ করছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। প্রশ্ন উঠছে এই পাসপোর্ট করতে রোহিঙ্গারা এনআইডি ও খরচের এত অর্থ পাচ্ছে কোথায়?

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে জানা যায়, গত সপ্তাহে টেকনাফের হ্নীলা জাদিমুরা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা নূর মোহাম্মদের বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র- এনআইডি ছিলো। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী তিন রোহিঙ্গা যুবক আটক হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার নানা কাহিনী ও কৌশলের কথা জানা যাচ্ছে।

ওই তিন যুবকের মধ্যে দু'জন হলেন মিয়ানমারে মংডু জেলার অংচি গ্রামের আলী আহমদের ছেলে মো. ইউসুফ ও মো. মুসা, আরেকজন মিয়ানমারের একই এলাকার মো. আজিজ। তারা গত ডিসেম্বর নোয়াখালীর সেনবাগের ঠিকানা ব্যবহার করে এনআইডি সংগ্রহ করেন, পরবর্তীতে নোয়াখালীর আঞ্চলিক পার্সপোর্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করেন পাসপোর্ট।

শুধু পাসপোর্ট নিয়ে বলে থাকেননি তারা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলেন, সেই পাসপোর্ট দিয়ে তুরস্কের ভিসার আবেদন করতে। চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘‘তাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ড এবং পাসপোর্ট দালালরা করে দিয়েছে। দালালরাই তাদের ওই কাজের সময় নোয়াখালী নিয়ে কয়েকদিন রেখেছিল। তিন জন দালালের নাম তারা জানিয়েছে। তারা ওই তিন দালালকে তিনটি পাসপোর্টের জন্য যথাক্রমে এক লাখ পাঁচ হাজার, ৯০ হাজার এবং ৬০ হাজার টাকা দিয়েছে। দুটি পাসপোর্ট করা হয় ডিসেম্বরে এবং একটি জানুয়ারি মাসে।''

সারাদেশেই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করে দেয়ার জন্য এইরকম আরো অনেক দালাল চক্র আছে বলেও জানান জানান মোস্তাফিজুর রহমান।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসেও গত এক মাসে আরো চারজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবু সাঈদ জানান, ‘‘আমরা মূলত ইন্টারভিউ করে ওই চারজনকে শনাক্ত করে পুলিশে দিয়েছি। কিছু কৌশগত প্রশ্ন করলেই তারা ধরা পড়ে যায়। আবার ভাষার কারণেও ধরা পড়ে। যেমন বাংলাদেশি নাগরিক হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে সে বলতে পারবে। তবে দালালরা আমাদের কৌশল জেনে যায়। তাই আমাদেরও কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধনের কাগজ তারা কিভাবে জোগাড় করে এটাই প্রশ্ন।''

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজারের উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের ডয়চে ভেলেকে এই কৌশলের একটি ধারণা দিয়েছিলেন।

‘‘ধরুন, ময়মনসিংহে এক নারীর নাম মরিয়ম। তিনি বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাঁর ন্যাশনাল আইডি কার্ড জোগাড় করে নাম, ঠিকানা, পিতা বা স্বামীর নাম সবই ঠিক রাখা হয়। এই একটি ডকুমেন্ট ধরেই আরো প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পাওয়া যায়। এরপর ওই নামেই আরেক রোহিঙ্গা নারীর জন্য পাসপোর্টের আবেদন করা হয়।''

এই দুর্নীতির সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের নিম্ন পর্যায়ের কিছু কর্মচারীও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সোহায়েল হোসেন খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরাই তো রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করছি। এ পর্যন্ত পাসপোর্টের আবেদন করতে আসা কয়েকশ' রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে পুলিশে দিয়েছি। তবে তারা আবেদনের আগে এনআইডি, জন্ম নিবন্ধন কিভাবে পায় তা তো আমরা বলতে পারব না। তারাতো পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টও পায়।''

তিনি বলেন, ‘‘আমরা আমাদের সব পাসপোর্ট অফিসকে সতর্ক করেছি। এখন আমরা সফটওয়ার ব্যবহার করছি ভুয়া আবেদন ধরার জন্য। আর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমেও শনাক্ত করছি। বিশেষ করে আমাদের কাছে দেয়া ফিঙ্গার প্রিন্ট, রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট এবং এনআইডির ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে দেখছি।''

তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট আমরা এনআইডি প্রকল্পকে দিয়েছি। তারপরও তো রোহিঙ্গারা এনআইডি পাচ্ছে।''

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের যে তালিকা, ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে, তার বাইরেও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছেন।

চট্টগ্রাম এলাকায় অন্তত ৭৩টি সন্দেহজনক এনআইডি দেখা গেছে সার্ভারে। এ নিয়ে ঢাকায় এই প্রকল্পের দায়িত্বশীল কাউকে কথা বলার জন্য পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনির হোসাইন খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটা খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে ঢাকা থেকে। তার একজন সদস্য উপ সচিব খুরশিদ আলম এরই মধ্যে চট্টগ্রামে আছেন তদন্তের জন্য।''

রোহিঙ্গারা কিভাবে এনআইডি পায় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘‘এটা তদন্ত শেষে বলা যাবে।''

গত বছরের এপ্রিলে তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময়ে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে অবৈধ উপায়ে পাসপোর্ট সংগ্রহের অভিযোগে কমপক্ষে চারশ' রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ আটক হয়েছেন। - ডিডাব্লিউ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা