kalerkantho

চিরনিদ্রায় শায়িত অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ

দেবীদ্বার(কুমিল্লা) প্রতিনিধি   

২৫ আগস্ট, ২০১৯ ১৭:২০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চিরনিদ্রায় শায়িত অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ

ভারতীয় উপমহাদেশের বাম রাজনীতির পুরোধা, বর্ষিয়ান রাজনীতিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদকে ফুলেল শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় চির বিদায় জানাল দেবীদ্বারবাসী।

রবিবার বেলা ২টায় প্রয়াত নেতার নিজ বাড়ি এলাহাবাদ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’ এর কার্যালয়ের সামনের মাঠে চতুর্থ জানাযা শেষে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে গার্ড অব অনার ও রাষ্ট্রীয় সালাম প্রধান করেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বিপিএম (বার) পিপিএম ও দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবীন্দ্র চাকমা। পরে তাকে ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’ এর কার্যালয়ের দক্ষিণ পাশে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।

বাংলাদেশের বাম- প্রগতিশীল রাজনীতিতে আলো ছড়ানো অনন্য ব্যক্তিত্ব, দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রসেনা, কারা নির্যাতিত জননেতা, ধর্ম-কর্ম সহ সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগর (প্রবাসী) সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সর্বশেষ উপদেষ্টা, ১৯৭১-এ ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন এর যৌথ উদ্যোগে গঠিত বিশেষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা, কুমিল্লা-৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর সভাপতি, নির্লোভ-ত্যাগী রাজনীতিক ও ভাষা সৈনিক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ(৯৮) এর লাশ সকাল ১০টায় কুমিল্লা টাউনহল মাঠে আনা হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, সংগঠন, সুশীল সমাজ সহ সর্বসাধারণ প্রয়াত নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে আসেন ও নেতার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এর আগে শনিবার সকাল ১০টায় ঢাকা জাতীয় সংসদ এর দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সালাম ও শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জানাযা শেষে ঢাকা ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর দুপুর সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হয়। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সুশীল সমাজ সহ সর্বসাধারন কর্তৃক প্রয়াত নেতাকে শেষবারের মতো দর্শন ও নেতার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাদ আসর জাতীয় বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গনে দ্বিতীয় জানাযা সম্পন্ন করা হয়েছে। রাত পৌনে ৮টায় প্রয়াত নেতার মরদেহ নিজ গ্রামের বাড়ি এলাহাবাদ নিয়ে আসা হয়।

তিনি দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর শুক্রবার রাত ৭টা ৪৯মিনিটে ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ‘ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।’ বার্ধক্যজনিত কারনে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষনে ছিলেন। এই ত্যাগী রাজনীতিকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সুশীল সমাজ শোক প্রকাশ ও তার শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

প্রয়াত নেতার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এ,এফ,এম ফখরুল ইসলাম মূন্সী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন এর যৌথ উদ্যোগে গঠিত বিশেষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী, ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’ দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গনসংগঠন, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী সংস্থা, ব্যক্তি উদ্যোক্তা সহ সর্বস্তরের মানুষ।

জানাযার পূর্বে মরহুমের জীবন ও কর্ম নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নেন, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, কুমিল্লা-৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, সাবেক রাষ্ট্রদুত মোঃ আবদুল হান্নান, যুগ্ম সচিব আব্দুল মান্নান ইলিয়াস, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আবদুল্লাহ আল কাফি রতন, ন্যাপের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ আলী ফারুক, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি অধ্যক্ষ এম হুমায়ুন মাহমুদ, কুমিল্লা উত্তর জেলা ন্যাপ সভাপতি সফিকুল ইসলাম সিকদার, প্রবীণ ন্যাপ নেতা মুস্তাকুর রহমান ফুল মিয়া প্রমুখ।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের ছয়জন উপদেষ্টার মধ্যে একজন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

১৯২২ সালে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তিত্ব ১৯৩৭ সালে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। রাজনীতি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লোভনীয় চাকরি ছেড়েছেন। তিনি যখন ঢাকা কলেজের শিক্ষক তখন থাকতেন আজমপুরে আট/ আই কলোনির বাসাতেই। সেখানেই ভাষা আন্দোলনকে সংগঠিত করার মিটিং হয়েছিল।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে মোজাফফর আহমেদ দেবীদ্বার থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তদানীন্তন মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রী মফিজুল ইসলামকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে নজির সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্ত্বশাসিত করার প্রস্তাব করে তিনি অনেক রাঘব বোয়ালের রাজনীতিতে ধাক্কা দিয়েছিলেন। যদিও বা সেই প্রস্তাব পাশ হয়েছিল, তথাপি তখন সেটা খুব সহজ কথা ছিলনা। পূর্ব পাকিস্থান গণপরিষদে তার ওই প্রস্তাবের পক্ষে বক্তৃতা করে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে ইতিহাসের মহানায়ক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় দফা প্রথমদিকে যারা জোরালোভাবে সমর্থন করে এগিয়ে নিয়েছিলেন তাদের অন্যতম অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ।

১৯৬৮ সালে ন্যাপ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একভাগ মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে থাকলেও অন্য অংশ অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে আলাদা হয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাজউদ্দিন আহমেদ ছয় জন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। যেখানে মাওলানা ভাসানী, মণি সিং, মনোরঞ্জন ধরের মতো রাজনীতিবিদরা ছিলেন। তাদের অন্যতম কমরেড মোজাফফর আহমেদ। বাম সমর্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে তখন একটি বিশাল মুক্তিযোদ্ধাবাহিনীও গঠন করা হয়েছিল। তার নেতৃত্বও দিয়েছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিদেশে জনমত গঠন করতে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। তাকে তখন জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দিতেও হয়েছিল।

১৯৭৯ সালে তিনি পুনরায় দেবীদ্বার থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে `কুঁড়েঘর` মার্কায় প্রার্থী হন। ‘আমার নাম মোজাফফর, মার্কা আমার কুঁড়েঘর’ এই স্লোগানে দোকানে দোকানে তাকে সহজ সরল ভাবে ভোট চাইতে দেখা যায়। যদিও বা পাতানো সেই নির্বাচনে তার প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয়েছিল মাত্র ১ শতাংশ তথাপি বন্দুকের নলের দিকে বুক তাক করে করা সেই সাহসী রাজনীতি ইতিহাসে দাগ কেটে গেছে।

নিরিবিলি রাজনীতি করার সুযোগ তিনি কখনো পাননি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান তার নামে হুলিয়া জারি করেন। তখন তার মাথার দাম হাঁকা হয়েছিল। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বেশীর ভাগ সময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর তাকে আবার আত্মগোপনে যেতে হয়। শুধুমাত্র রিক্সাভাড়া পকেটে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে এরশাদ ক্ষমতায় এলে তাকে আবার আত্মগোপনে যেতে হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা