kalerkantho

'কমিশন গঠন করে পঁচাত্তর পরবর্তী ইতিহাস খুঁজতে হবে'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'কমিশন গঠন করে পঁচাত্তর পরবর্তী ইতিহাস খুঁজতে হবে'

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেই শেষ হয়ে যায়নি বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞ। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর সেনাবাহিনীতে থাকা প্রচুর মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসির আদেশ দেন। যার সঠিক ইতিহাস কারো জানা নেই। আর এই সঠিক ইতিহাস খুঁজে বের করতে হলে কমিশন গঠন করতে হবে।

আজ শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) আয়োজিত ‘ইতিহাসের অবরুদ্ধ অধ্যায়: ১৯৭৫-৯৬’ শীর্ষক আলোচনায় কথাগুলো উঠে আসে।

সাংবাদিক জাহিদুল হাসান পিন্টু বলেন, আমার গবেষণায় পাওয়া তথ্যে কুমিল্লার জল্লাদ একাই সে সময় ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন ৯২ জনকে। এই ফাঁসি কার্যকরের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে জেনেছি, ফাঁসির রায়ে আগেই জিয়ার সই দেওয়া থাকত। তারা শুধু জিয়ার দেওয়া রায় পড়ে শোনাত।

এ সময় তিনি আরো বলেন, খাবার টেবিলে বসে জিয়া একহাতে খাবার খেয়েছে ও অন্যহাতে ফাঁসির আদেশে সই করে গেছে। এমনকি ফাঁসির আদেশে সই করার জন্য তার সাথে বিমানবন্দর পর্যন্ত গিয়েছে সেনা সদস্যরা।

তিনি আরো বলেন, ১৯৮৩ সালে এরশাদের নির্দেশে জিয়ার এই হত্যাযজ্ঞের যাবতীয় প্রমাণ পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু আমি একটি বই পেয়েছি যা বিমান বাহিনী থেকে এর আগে প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা ছিল, 'বিমান বাহিনী হারিয়েছে তার ৫৮১ জন সদস্যকে।'

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা ও পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বলা হয়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অবরুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড

সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা বজায় রাখতে এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে স্থান করে দিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়। এ সময় ১১ হাজার ৪৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আরো সারে ৪ হাজার সেনা সদস্যের উপর নির্যাতন চালানো হয়।

তারানা হালিম বলেন, দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের জন্য পায়ে বালির বস্তা বেঁধে ঝোলানো হতো। একই নামের দুইজনের একজন যাবজ্জীবন ও ওপর জনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলেও দ্রুত কার্যকর করার জন্য দু'জনকেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।

বাবার হত্যাকারীদের নাম লেখা হতো না

বুদ্ধিজীবী সন্তান নুজহাত চৌধুরী বলেন, জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করে আমার বাবাকে হত্যা করা আত্মস্বীকৃত খুনি দৈনিক ইনকিলাবের মাওলানা এম এ মান্নানকে প্রতিমন্ত্রী করেন। আর এরশাদ তাকে পূর্ণমন্ত্রী করেন।

এ সময় তিনি প্রশ্ন করেন, কেন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে যুদ্ধাপরাধীদের পুনস্থাপন করেছিলেন জিয়া? কেন যুদ্ধ চলাকালে তাকে সেক্টর কমান্ডার পদ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন জেনারেল ওসমানি? তিনি কি আইএস-এর এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশকে আবারো পাকিস্তান বানানোর এজেন্ডা হাতে নিয়েছিলেন? আমার মনে হয় এ প্রশ্নগুলো করার সময় এসেছে।

আলোচকেরা জানান, জিয়ার সময় থেকে পরবর্তী ২১ বছর মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা পাকিস্তানি সৈন্য কথাগুলো ব্যবহার করেনি গণমাধ্যম। জিয়ার সময় শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগ নামই উচ্চারণ করেনি কেউ। আর এরশাদের আমলেও তাচ্ছিল্য করে লেখা হতো শুধু শেখ মুজিব। মুক্তিযুদ্ধকে বলা হতো স্বাধীনতা যুদ্ধ, পাকিস্তানি সৈন্যের বদলে বলা হতো হানাদার বাহিনী। এর মূল কারণ, ওই প্রজন্মের যেন পাকিস্তান বিরোধী চেতনা তৈরি না হয়।

সঠিক ইতিহাস চর্চার সময় এখনই

এ সময় বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস চর্চার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে ব্লগার ও কলামিস্ট মারুফ রসুল বলেন, সরকারের এ বিষয়ে পৃথক একটি অধিদপ্তর খোলা প্রয়োজন। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে চলা প্রোপাগান্ডা মুকাবিলায় সরকারের প্রতিটি দপ্তরকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এ সকল স্থানে সরকারি দপ্তরগুলোর অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা বাড়াতে হবে

প্রোপাগান্ডা মুকাবিলায় গণমাধ্যমের ভূমিকা আরো বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান। তিনি বলেন, বিদেশে যেকোনো গণমাধ্যমের প্রতিটি বিভাগ ভিত্তিক ফেসবুক ভেরিফাইড পেইজ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের তা নেই। তিনি একটি বেসরকারি টিভির নাম উল্লেখ করে জানান, তাদের নামে ২০টির বেশি ফেসবুক পেজ রয়েছে যেগুলো থেকে মাঝে মধ্যে ভুল তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু এ সবগুলো পেজ ঐ প্রতিষ্ঠানের নয়।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার জন্য ফান্ড প্রদান করা উচিত বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এখনো উইকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু ভুল তথ্য দেওয়া আছে যা রেফারেন্সের অভাবে ঠিক করা যাচ্ছে না। আর সে জন্য আমাদের প্রচুর গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রয়োজন।

এ সময় আলোচকেরা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের চেতনাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিগুলো। আর সে কারণেই এখনো ওই অশুভ শক্তি মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যা করে যাচ্ছে।

তরুণদের উপস্থিতিতে হওয়া এই আলোচনা সভার উপস্থাপনা করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা