kalerkantho

অসদাচরণের অভিযোগে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু

বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ আগস্ট, ২০১৯ ১২:৩৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অসদাচরণের অভিযোগে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে গুরুত্বর অসদাচরণের (আচরণবিধি লঙ্ঘন) অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট তিন বিচারপতিকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত জানার পর সংশ্লিষ্ট তিন বিচারপতি আজ বৃহস্পতিবার ছুটির আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তিন বিচারপতি হলেন, সালমা মাসুদ চৌধুরী, ড. কাজী রেজা-উল হক ও একেএম জহিরুল হক। 

এক সঙ্গে তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বাংলাদেশে এই প্রথম। এ ঘটনাকে নজীরবিহীন উল্লেখ করে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিনউদ্দিন ও সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন স্বাগত জানিয়েছেন। তারা জানান, বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষায় এরকম পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিলো। 

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অন্যান্য যারা আছেন তাদের মধ্যে যারা নিজেদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করছেন না তাদের প্রতি এটা একটি বার্তা।

সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘মাননীয় তিনজন বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে পরামর্শক্রমে তাদের বিচার কার্য থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করা হয় এবং পরবর্তীতে তারা ছুটির প্রার্থনা করেন।’

জানা যায়, আজ সকালে তিন বিচারপতিকে অনুসন্ধানের কথা জানিয়ে তাদের বিচার কাজ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থেই তাদের বিচারিক কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। এর আগে বুধবার আপিল বিভাগের বিচারপতির এক বৈঠকে ওই তিনজনকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরও আগে ওই তিন জনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতি পরামর্শ করেছেন বলে জানা যায়। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত জানার পরই প্রধান বিচারপতি পদক্ষেপ নেন। 

ওই তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে কোন প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান কাজ চলবে তা আপিল বিভাগের সকল বিচারপতি বসে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গেছে। বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠলে আগে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্ত করতো। কিন্তু সরকার সংবিধানের সেই পদ্ধতি বাতিল করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী করে। তাতে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে একটি আইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল বলে রায় দিয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদন বিচারাধীন। এরই মধ্যে হাইকোর্টেল বিচারপতি মিজানুর রহমান ভুইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ কুমার সিনহার আমলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। এরপরও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে কিনা তা নিয়ে বির্তক ওঠে। এ অবস্থায় তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ কে কোন প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

জানা গেছে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সিনিয়র তিন বিচারপতি বিষয়টি অনুসন্ধান করবেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। তবে আপিল বিভাগের সকল বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। 

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, টেকনিক্যাল বিষয়ে বিতর্ক তুলে বিষয়টি এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করেই প্রধান বিচারপতি অনুসন্ধানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের সকল বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, ওই তিনজনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করেই প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইনজীবীরা সকলেই চান আমাদের আদালতটা সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকুক। এ কারণে অনেক আগে থেকেই সুপ্রিম কোর্টের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে ও বিচার বিভাগকে কলুষমুক্ত রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ছিল আইনজীবীদের। 

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচার বিভাগকে সঠিক রাস্তায় রাখার জন্য এটা প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতির প্রাথমিক দায়িত্ব। আইনজীবী বা অন্য কেউ যাতে কোনো বিচারপতি সম্বন্ধে আর কোনো খারাপ কথা বলতে না পারে অথবা কোনো অভিযোগ তুলতে না পারে সেটাই আমরা কামনা করি। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, বিচার বিভাগকে কলুষমুক্ত করার জন্য যা যা করা দরকার, সবই করবেন প্রধান বিচারপতি।

তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে কি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অভিযোগ সেটা অনুসন্ধানের পরেই জানা যাবে। কী অভিযোগ তা জনসমক্ষে প্রকাশ করাটা বিচার বিভাগের জন্য শুভ হবে না। আর এটা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির ব্যাপার এবং সেভাবেই দেখতে হবে। 

এরআগে গত ১৬ মে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চে একটি সিভিল মামলায় (ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ও অন্যান্য বনাম এম আর ট্রেডিং কম্পানি ও অন্যান্য) অনিয়মের অভিযোগ তুলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের বিরুদ্ধে ‘অস্বাভাবিক আদেশ’ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর পরামর্শ দেন। এবিষয়ে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সেদিন আদালতে অভিমত দেন। ওই মামলায় এম আর ট্রেডিংকে এককোটি টাকা জরিমানা করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এরপরই হাইকোর্ট বিভাগের ওই দুই বিচারপতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সম্মতি নেন প্রধান বিচারপতি।  

বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী

সাবেক বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসুদের মেয়ে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ১৯৮১ সালে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে ১৯৮৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৯৬ সালে আপিল বিভাগে তালিকাভুক্ত হন। আইনজীবী হিসেবে পেশা পরিচালনাবস্থায় তিনি ২০০২ সালের ২৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর ২০০৪ সালে হাইকোর্টে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। সেই থেকে হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।  

বিচারপতি ড. কাজী রেজা-উল হক

বিচারপতি ড. কাজী রেজা-উল হক এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রী অর্জনের পর যুক্তরাজ্য থেকে এলএলএম এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে নটিংহ্যাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জেলা বার এবং ১৯৮৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। সেই থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। 

বিচারপতি একেএম জহিরুল হক

এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর একেএম জহিরুল হক ১৯৮৪ সালে জেলা বারে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর ১৯৯০ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০০২ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। সেই থেকে তিনি বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা