kalerkantho

অনেকেরই হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, যৌনাঙ্গসহ নানা অঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

বয়সের সঙ্গে বাড়ছে যন্ত্রণা

তৈমুর ফারুক তুষার    

২১ আগস্ট, ২০১৯ ১২:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনেকেরই হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, যৌনাঙ্গসহ নানা অঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তখনকার বিরোধী দল নেতা শেখ হাসিনার জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আহত ব্যক্তিরা এখনো অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট ভোগ করছেন। বেশির ভাগেরই শরীরে রয়ে গেছে গ্রেনেডের এক-দুই হাজার স্প্লিন্টার। ফলে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তাঁরা। অনেকেরই হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, যৌনাঙ্গসহ নানা অঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তাঁদের শারীরিক যন্ত্রণাও। এই তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে কেউ কেউ ভাবেন, এর চেয়ে মরে যাওয়াই বোধ হয় ভালো ছিল।

সেই ভয়াবহ হামলার কথা স্মরণ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমাবেশের শেষের দিকে আইভি রহমান আপা কয়েকজন নারীকর্মীর সঙ্গে মঞ্চের সামনের দিকে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি তখন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আমি আইভি আপার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। নেত্রী (শেখ হাসিনা) বক্তব্য শেষে মঞ্চ থেকে নামার সময়েই গ্রেনেড হামলা হয়। শুরুতে একটা শব্দ হলে আমি ভাবলাম ট্রাকের টায়ার ফেটে বাতাস এসে বুঝি লাগল। কিন্তু এর পর আবারও শব্দ হলো। তখন বুঝলাম আমরা আক্রান্ত হয়েছি।’

বজলুর রহমান বলেন, ‘হামলার পর সবাই ছোটাছুটি শুরু করলে আমি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দিকে এগিয়ে যেতে মনস্থির করলাম। কিন্তু কয়েক ফুট এগিয়ে যাওয়ার পরই বুঝলাম আমি হাঁটতে পারছি না। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। খেয়াল করলাম আমার শরীরের নিম্নাংশ রক্তে ভেজা। ক্রল করে কয়েক গজ এগিয়ে যাওয়ার পরই চৈতন্য হারালাম।’ তিনি জানান, ভারতের পিয়ারলেস হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। এর আগে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর যৌনাঙ্গে থাকা স্প্লিন্টার বের করা হয়। এখনো শরীরে ৫৮টি স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন বজলুর রহমান। এর মধ্যে ৯টির কারণে মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি। তিনটি স্প্লিন্টার আছে রক্তনালীতে।

 

বজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনে আর ফেরা যায়নি। ১৫ বছর আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। রক্তনালীর স্প্লিন্টারগুলো রক্তের প্রবাহের সঙ্গে চলাফেরা করে। দীর্ঘ সময় ঘুমালে এই স্প্লিন্টার তিনটি এক জায়গায় চলে আসে। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তখন মালিশ করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে হয়। এ কারণে আমাকে বেশির ভাগ সময়ই চলাফেরা করতে হয়। কিডনির স্প্লিন্টারও আমাকে মারাত্মক ভোগাচ্ছে। এই স্প্লিন্টারটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু অস্ত্রোপাচারের সিদ্ধান্তের পর জানা যায়, আমার শরীরে কিডনিই রয়েছে একটি। ফলে আর ডাক্তাররা অস্ত্রোপচার করেননি। অণ্ডকোষে থাকা স্প্লিন্টারের কারণেও আমি মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় ভোগী। প্রায়ই ব্যথা অনুভব করি। ব্যথা তীব্র হলে ওষুধ খেয়ে কমাতে হয়।’

ভয়াল সেই গ্রেনেড হামলায় আহত হন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আসা গণমাধ্যমকর্মীরাও। ওই সময় বেসরকারি টিভি চ্যানেল আইর প্রতিবেদক ছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন। গ্রেনেড হামলায় তিনি শতাধিক স্প্লিন্টার বিদ্ধ হন। এখনো শরীরে সেই স্প্লিন্টার বহন করে চলেছেন তিনি। আশরাফুল আলম খোকন কালের কণ্ঠকে জানান, স্প্লিন্টারের কারণে নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন তিনি। বিশেষ করে শীতের সময়ে স্প্লিন্টারগুলো বেশি মাত্রায় যন্ত্রণা সৃষ্টি করে।

গ্রেনেড হামলায় মারাত্মক আহত হন তৎকালীন ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাসিমা ফেরদৌস। এখনো শরীরে দেড় হাজারের মতো স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর ফুসফুস, কিডনি, হৃৎপিণ্ডের পাশসহ সারা শরীরে ছড়িয়ে আছে এসব স্প্লিন্টার। গ্রেনেড হামলায় দুই পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, যা এখনো মারাত্মকভাবে ভোগাচ্ছে নাসিমাকে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শরীরে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। অন্যের সাহায্য নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। সেই ২০০৪ সালে আহত হওয়ার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও আমি স্বস্তিতে থাকতে পারি না। মাঝে মাঝে ভাবি এত যন্ত্রণার চেয়ে মরে যাওয়াই বুঝি ভালো ছিল।’

গ্রেনেড হামলায় শরীরে প্রায় এক হাজার ৮০০ স্প্লিন্টার নিয়ে দুর্বিসহ এক জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মাহবুবা পারভিন। এখনো তাঁর বাঁ হাত ও বাঁ পা অনেকটাই অকেজো। দীর্ঘ পাঁচ বছর হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেছেন। এরপর চলতেন ক্র্যাচে ভর করে। এখনো চলাফেরা ও খাওয়ার সময় অন্যের সাহায্য নিতে হয়।

মাহবুবা পারভিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিদিন প্রচুর ওষুধ খেতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে নানা সমস্যাও বাড়ছে। তবে বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাদের দেশ-বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়েছেন। এখনো প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পাই ওষুধ কেনার জন্য। তিনি এসব না করলে আমরা এত দিন বাঁচতে পারতাম না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা