kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

কমনওয়েলথের কথ্য ইতিহাস প্রকল্প থেকে

ভুট্টোকে দেখে বঙ্গবন্ধু বলেন 'আপনিও বন্দি?'

মেহেদী হাসান    

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ১০:৩৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভুট্টোকে দেখে বঙ্গবন্ধু বলেন 'আপনিও বন্দি?'

১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার কয়েক দিন আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। বঙ্গবন্ধু প্রশ্ন করলেন, ‘আপনাকেও কি আটক করা হয়েছে?’ ভুট্টো জবাব দেন, ‘না। আমি প্রেসিডেন্ট।’ বঙ্গবন্ধু প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কিভাবে প্রেসিডেন্ট হলেন? কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন আমি পেয়েছি।’ ভুট্টো এবার বলেন, ‘ঠিক আছে। আপনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিন।’ বঙ্গবন্ধু এ পর্যায়ে বলেন, ‘না। তামাশা ছাড়ুন। আমি যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে ফিরতে চাই।’

এরপর বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর আলোচনায় কামাল হোসেনের প্রসঙ্গ এলো। তিনিও তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। বঙ্গবন্ধু তাঁকে নিয়েই বাংলাদেশে আসতে চান।

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ফেরার পথে লন্ডন যাওয়ার বিষয়টি আরো নাটকীয়। পাকিস্তান বলছিল, তারাই বঙ্গবন্ধুকে ফ্লাইটে করে পৌঁছে দেবে। কিন্তু আকাশসীমা বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের ফ্লাইট এদিকে আসতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে ট্রানজিট হিসেবে পাকিস্তান বঙ্গবন্ধু ও কামাল হোসেনকে যেখানে পৌঁছে দিতে চায় তা তাঁদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। লন্ডনে পাঠানোর প্রস্তাব যখন এলো তখন তাঁরা একে স্বাগত জানালেন।

২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর লন্ডনে অক্সফোর্ড অ্যান্ড কেমব্রিজ ক্লাবে কমনওয়েলথের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. সু অনস্লোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেসব ঘটনা তুলে ধরেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। ১৯৭১ সালের ২৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান কামাল হোসেন। ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারির দিকে জুলফিকার আলী ভুট্টো এক জনসভায় ঘোষণা দেন, বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশে ফিরতে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে তখন রাখা হয়েছিল ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে পুলিশ একাডেমির অতিথিশালায়। সেখানে পরে কামাল হোসেনকেও আনা হয়েছিল।

পাকিস্তান ছাড়ার আগে বঙ্গবন্ধু ও কামাল হোসেনকে জানানো হয়েছিল, ফ্লাইট যখন লন্ডনের কাছাকাছি পৌঁছবে বা দু-এক ঘণ্টার দূরত্বে থাকবে তখনই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে, ফ্লাইটে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান আছেন।

ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লন্ডনে পৌঁছা বেশ নাটকীয় ও আবেগময়। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ভিআইপি এরিয়ার দিকে। দায়িত্বরত ব্রিটিশ ‘ববিরা’ (পুলিশ কর্মকর্তা) এগিয়ে এলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘স্যার, আপনাকে দেখে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছিলাম।’

ভিড় ঠেলে বঙ্গবন্ধু যখন সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন একটি ঘোষণা এলো—‘এখানে শেখ মুজিব আছেন? শেখ মুজিবুর রহমান? কেউ কি দেখবেন তিনি এখানে আছেন কি না? তাঁর একটি ফোন কল এসেছে।’ কামাল হোসেনকে বলা হলো ফোনে কথা বলতে। ফোনের অপর প্রান্তে নিজের পরিচয় দিলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের ইয়ান সাদারল্যান্ড। এর আগে ঢাকায় তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল।

সাদারল্যান্ডের প্রশ্ন ছিল, ‘শেখ মুজিব কি সত্যিই এসেছেন?’ কামাল হোসেন জবাব দেন, ‘হ্যাঁ। সত্যিই তিনি এখানে (লন্ডনে)।’ সাদারল্যান্ড বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি স্বস্তির খবর। আমি ৪০ মিনিটের মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছাব। ব্রিটিশ সরকার শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান হিসেবে স্বাগত জানাবে এবং পূর্ণ প্রটোকল (রাষ্ট্রাচার) অনুসরণ করবে।’

এসব কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তাঁদের বলো আমরা এখানে আমাদের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই।’ তখন লন্ডনে বাংলাদেশে কূটনৈতিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ইয়ান সাদারল্যান্ড জানান, আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডন থেকে ঢাকায় গেছেন। লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনে আবু সাঈদের পরের ব্যক্তির (ডেপুটি হাইকমিশনার) ফোন নম্বরটি সাদারল্যান্ডই দিলেন। তিনিও ছুটে এলেন বিমানবন্দরে।

সেদিন বিমানবন্দরে এসেছিলেন লন্ডনে পাকিস্তানের হাইকমিশনারও। বঙ্গবন্ধুকে তিনি বলেন, ‘আমরা আপনার জন্য কি কিছু করতে পারি?’ শেখ মুজিব জবাব দিয়েছিলেন, ‘ধন্যবাদ। যথেষ্ট করেছেন। আপনারা যা করেছেন তাতে আমি কৃতজ্ঞ।’

পাকিস্তানের হাইকমিশনার বলেন, ‘আমরা কি আরো কিছু করতে পারি?’ বঙ্গবন্ধু এবার বলেন, ‘না। আপনি পারেন না। আর কিছু নেই যা আপনারা করতে পারেন। আমি বলতে চাচ্ছি, আপনারা আমাদের এত দূর এনেছেন, এতেই আমি কৃতজ্ঞ।’

ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনার পর জানালেন যে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ স্বাগত জানাবেন এবং ক্লেরিজ হোটেলে তাঁর থাকার আয়োজন চলছে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দেখুন। আগের সফরগুলোতে আমি সব সময় রাসেল স্কয়ারে থেকেছি। কারণ আমাদের বাঙালি লোকদের জন্য সেখানে আসা অনেক সহজ। আর আমারও রাসেল স্কয়ারে জানাশোনা আছে।’ জবাবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এই অনুরোধ তাঁদের পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। কারণ বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান/সরকারপ্রধানদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু ক্লেরিজেই দেওয়া সম্ভব।

এডওয়ার্ড হিথ সেদিন লন্ডনের বাইরে ছিলেন। সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসেন। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে সেদিন বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান হিথ। তিনি ও তাঁর কর্মকর্তারা হয়তো সেদিন বাংলাদেশি নেতার রাসেল স্কয়ারে থাকার আগ্রহের গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। কিন্তু ক্লেরিজ হোটেলেই সেদিন বাঙালি, বাংলাদেশিদের উপচে পড়া ভিড় নেমেছিল।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, পাকিস্তান কমনওয়েলথের সদস্য ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক আছে; কিন্তু বাংলাদেশিদের ওপর পাকিস্তানের সামরিক হামলাকে যুক্তরাজ্য সমর্থন করেনি। হিথ ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের কাজ করার ব্যাপারে কয়েক সপ্তাহ সময় চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আর কিভাবে যুক্তরাজ্য সহযোগিতা করতে পারে? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে আপনি সহযোগিতা করতে পারেন।’

হিথ বলেছিলেন, তাঁর অধীনে কয়েকটি ফ্লাইট আছে। তিনি তাঁর সচিবকে বিষয়টি দেখতে বললেন। তখন লন্ডনে সন্ধ্যা ৫টা। ততক্ষণে হিথের সচিব জানালেন, পরদিন সকাল ৭টা নাগাদ একটি ফ্লাইট তৈরি হয়ে যাবে।

এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার সম্ভাবনার কথা ছড়িয়ে পড়ল। ভারত থেকে অনুরোধ করা হলো নয়াদিল্লি ও কলকাতায় যাত্রাবিরতি করার। অন্যদিকে ঢাকা থেকে বলা হলো দিনের আলোতে ফিরতে। বঙ্গবন্ধুকে দেখতে অনেক লোক অপেক্ষায় থাকবে। এরপর নয়াদিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন।

ড. সু অনস্লোকে দেওয়া ড. কামালের সাক্ষাৎকারে কমনওয়েলথ, বাংলাদেশের সংবিধান ছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গ এসেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু যখন সপরিবারে হত্যার শিকার হলেন তখন ড. কামাল এ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সু অনস্লোর প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, সে সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন না। পেরুতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ায় ছিলেন। যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। এরই সুবাদে যুগোস্লাভিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেরুতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের প্রস্তুতি ও ঘোষণার প্রস্তুতি নিতে ড. কামালকে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

ড. কামাল বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ১০ আগস্ট তিনি বেলগ্রেডে গিয়েছিলেন। শেখ মুজিব তাঁকে বলেছিলেন, ‘যুগোস্লাভিয়া যেহেতু এত করে বলছে, যাও।’ তবে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভারত সফরের আগেই ড. কামালকে চলে আসতে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই ভারত সফরের এজেন্ডা ছিল সমুদ্রসীমা বিরোধ। ড. কামাল মনে করেন, বঙ্গবন্ধু থাকলে সে সময়ই সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে যেত। এটি পরে নিষ্পত্তি হতে ৩০ বছরের বেশি সময় লেগেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দিনটি সম্পর্কে ড. কামাল অনস্লোকে বলেন, ‘যুগোস্লাভিয়ায় ১৫ আগস্ট সকালে আমি ভয়ংকর কিছু ঘটেছে বলে বার্তা পাই। সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ মুজিবের মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) তখন তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বন সফর করছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন বনে রিসার্চ ফেলো। আমি বন শহরে যাই।’

ড. কামাল বলেন, “যদিও আমার ঢাকার ফ্লাইট ধরার কথা ছিল। আমি বলেছি, ‘আমাকে অবশ্যই বনে যেতে হবে এবং সেখানের পরিস্থিতি দেখতে হবে।’ আমি সেখানে গেলাম এবং সারা দিন শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন রেহানার সঙ্গে কাটালাম। তাঁরা বললেন, ‘আপনি কি আমাদের ছেড়ে ও ফিরে যাচ্ছেন (ঢাকায়)?’ আমি বললাম, ‘না। আমি আপনাদের নিশ্চিত করছি যে আমি তা করছি না। আমি লন্ডন যাচ্ছি। কারণ সেখানে আমি আরো তথ্য পাব। আমি যদি ফিরে যেতে চাই তাহলে আমি দেখব কিভাবে আপনারাও সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে ফিরতে পারেন। এর আগে আমি ফিরে যাব না।’”

ড. কামাল বলেছেন, ১৫ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঘটল। ১৬ আগস্ট তিনি বঙ্গবন্ধুর মেয়েদের সঙ্গে ছিলেন। ১৭ আগস্ট তিনি লন্ডনে পৌঁছান। তিনি বলেন, লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে তিনি তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেন এবং বলেন, যে সরকার ক্ষমতা নিয়েছে তার সঙ্গে তাঁর কোনো কাজ নেই। হাইকমিশনের তৎকালীন কূটনীতিকরা ড. কামালকে বলেছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার জন্য তাঁকে ঢাকায় ডাকা হচ্ছে। ড. কামাল তাঁদের বলেন, প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই, সেখানে (ঢাকায়) আমার পরিবার প্রায় জিম্মি অবস্থায় ছিল। তাই আমি এমন কোনো প্রকাশ্য অবস্থান নিইনি যা তাদের বিপদে ফেলতে পারে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা