kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ আগস্ট ২০১৯। ৭ ভাদ্র ১৪২৬। ২০ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষজ্ঞ মত

দেশে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম নিয়ে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে

খন্দকার ফারজানা রহমান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ জুলাই, ২০১৯ ০৯:৫০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দেশে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম নিয়ে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে

বর্তমানে দেশে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম নিয়ে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। আইন আছে, শাসনব্যবস্থাও আছে; কিন্তু এই দুটি বিষয়কে একত্র করে অপরাধীর বিচারের ক্ষেত্র তৈরিতে ভালো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিভিন্নভাবে ক্রিমিনাল জাস্টিসকে কলুষিত করা হয়েছে। গণপিটুনির মতো নিষ্ঠুর অপরাধের বিচারও ঝুলছে বছরের পর বছর।

গণপিটুনির ঘটনায় মামলা করা নিয়ে বাংলাদেশের আইনে বড় সমস্যা রয়ে গেছে। বাড্ডায় এক মাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, যিনি সন্তানকে স্কুলে ভর্তির জন্য খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলেন। এই ঘটনায় পুলিশ ৪০০-৫০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির নামে মামলা করল। কিন্তু এই মামলার আসামি কারা? নির্দিষ্ট করা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। আর মানুষ এই আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে।

অনেকে না জেনে, না বুঝে গণপিটুনিতে অংশ নিচ্ছে, আবার কেউ উত্তেজনার বশবর্তী হয়েও এতে জড়িয়েছে। সরকার পুলিশকে অনেক বেশি ক্ষমতা দিয়েছে; কিন্তু তারা নিজস্ব গতিতে কাজ করতে পারে না। অপরাধী ধরার পর ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। যা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে অনাস্থায় শুধু সরকারকে দায়ী করলেই হবে না। আদালতে যত মামলা, এর চেয়ে বিচারকের সংখ্যা অপ্রতুল। তাহলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে কিভাবে? আবার মানুষ অনুপাতে পুলিশের সংখ্যাও আইন প্রয়োগ বা অপরাধ দমনে বড় দুর্বলতা? এমন দুর্বলতার সঙ্গে আছে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয়। দেশ এগিয়ে গেলেও মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ হ্রাস পাচ্ছে। সাইবার দুনিয়াও মানুষকে নিষ্ঠুর করছে। তারা মানবিক আচরণ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। গণপিটুনির মতো নিষ্ঠুর কাজে যুক্ত হতেও দ্বিধা করছে না।

গণপিটুনিতে জড়ানো ব্যক্তিদের আরেকটি অংশ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্তও হতে পারে। ব্যক্তিজীবন কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে হতাশা থেকে অবসাদের সৃষ্টি হয়। যেমন—কোনো কারণে কারো মেজাজ খারাপ থাকতে পারে। কাউকে পিটিয়ে বা মারধর করে মেজাজ ভালো করার ঘটনাও আছে। সামাজিক জীবনে বৈষম্য থেকেও প্রাত্যহিক জীবনের হতাশায় মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে তরুণরা অনেকটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া বেশির ভাগই মধ্যবয়স্ক।

‘চিলে কান নিয়ে গেছে’—এমন হুজুগে মন্তব্যেও মানুষ বাছবিচার না করে ছুটতে থাকে।

গণপিটুনির ঘটনা এ দেশে নতুন নয়। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়, আগের সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনায় মামলার কার্যক্রম ঝুলছে। ফলে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে গণপিটুনির সঙ্গে যুক্ত হলেও পার পাওয়া যায়। কাজেই ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। নিষ্ঠুরতার মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

গণপিটুনিও ক্রসফায়ারের মতো এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং। আইন আছে, বিচারব্যবস্থা আছে; কিন্তু বিচার না করে কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে কে দোষী বা না দোষী এটা বিচারের ক্ষমতা তো কেউ সাধারণ মানুষকে দেয়নি। এটা একটা দেশের জন্য কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না। ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে এটা চলে না। প্রচলিত বিচারব্যবস্থাকে বাইপাস করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বিচারব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।

গণপিটুনি একটি অপরাধ, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আবার মানুষকে সচেতন করে এই পথ থেকে ফেরানোও সম্ভব। পাঠ্য বইয়েও এ বিষয়ে পাঠ যুক্ত করতে হবে। কেউ অপরাধ করলে তাকে আমরা বেঁধে রাখতে পারি; কিন্তু মেরে ফেলতে পারি না। এই অধিকার আমার নেই, অপরাধীর বিচার আইন অনুযায়ীই হতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : রফিকুল ইসলাম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা