kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

পাস্তুরিত দুধের উৎপাদকরা সরকারের দিকে তাকিয়ে

পাস্তুরিত দুধ নিয়ে সংকট, সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা নেই

ভোক্তারা দুধ খাওয়া নিয়ে দ্বিধায় , খামারিরা দুধ বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে

শওকত আলী   

২২ জুলাই, ২০১৯ ০৯:৩৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাস্তুরিত দুধ নিয়ে সংকট, সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা নেই

ফাইল ফটো

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের পরীক্ষায় পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট, সিসাসহ বিভিন্ন কীটনাশক পাওয়ার ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। ফলে আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সবার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে কি পাস্তুরিত দুধ খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে? অথবা বিকল্প ব্যবস্থায় কী খাবে মানুষ? নানা পুষ্টিগুণসম্পন্ন এই দুধ শিশুদের প্রধান খাবার। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা।

মিরপুরে বসবাসকারী আরেফিন রনি নিয়মিত পাস্তুরিত দুধ খান। এসব প্রতিবেদন পাওয়ার পর তিনি পাস্তুরিত দুধ খাবেন কি না তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, ‘সিসা বা অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেল ভালো কথা। এখন কি এগুলো খাওয়া যাবে, না খাওয়া যাবে না—তা তো কেউ বলছেন না।’

ধানমণ্ডি কলাবাগানের বাসিন্দা মনির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘দুধ নিয়ে তো ভীষণ আতঙ্কে আছি! কয়েক দিন পরপর নানা প্রতিবেদন। তাহলে কোন দুধ ভালো, কোনটা খেতে পারব, সেটা তো সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করে জানাতে হবে। কারণ দুধগুলো তো বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা কি কিনব, না কিনব না?’

এমন প্রশ্ন বর্তমানে দুধের সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে। কিন্তু এর সমাধান দিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। অথচ সবাই চায় এর একটা পরিষ্কার সমাধান আসুক।

পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনকারী ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এবং খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাস্তুরিত দুধ নিয়ে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক খামারিরা। তাদের প্রতিদিনের রুটি-রুজি নির্ভর করে এই দুধ বিক্রির ওপর। বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কম্পানি প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ খামারির কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করত। কিন্তু প্রতিবেদন-সৃষ্ট আতঙ্কে গত তিন সপ্তাহে বাজারে কম্পানিগুলোর ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত দুধ বিক্রি কমে গেছে। ফলে খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে কম্পানিগুলো।

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দুগ্ধ খামারি খোকন বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পনেরো দিনের বেশি হলো কম্পানিগুলো আগের মতো আমাদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করছে না। দুধ বিক্রি করতে না পেরে আমরা মহাবিপদে পড়েছি। কারণ আমাদের প্রতিদিনের জীবন-জীবিকা এই দুধ বিক্রির ওপর নির্ভর।’

পাবনা, সিরাজগঞ্জ, শাহজাদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা এই একই সমস্যার মধ্যে আছে।

এদিকে দুধে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলেও এ থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি; যদিও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আদালতে দুধ পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আদালতকে আগামী ২৮ জুলাই জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতে প্রতিবেদন দাখিল নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়ে সংস্থাটি কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। তবে কম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় দুধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা সিসা প্রবেশ করার সুযোগ নেই। কম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে তাদের দুধ পরীক্ষা করে এ ধরনের কোনো সমস্যা খুঁজে পায়নি। ফলে আতঙ্কিত না হয়ে ভোক্তাদের নিয়মিত দুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে তারা। তবে তারা এও বলছে, গরুর খাবার, ঘাস ও পানি যদি বিশুদ্ধ না হয় তাহলে সেখানে দূষণ ঘটার আশঙ্কা থাকে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধানে কম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকলেও এখনো তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

কম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এর জন্য সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কোথায় সমস্যা হচ্ছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। তার পরই সবাই মিলে কাজ করলে সমাধান সহজ হবে। হুট করে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে দিলে ভোক্তারা যেমন আতঙ্কিত হয়, তেমনি দেশীয় এই শিল্প খাত পড়ছে সংকটে। এতে মানুষ বিকল্প খুঁজতে শুরু করবে। দেশে নিম্নমানের গুঁড়া দুধ আমদানি বেড়ে যাবে।

জাতীয় ডেইরি ডেভেলপমেন্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমদানি নির্ভরতা বাড়বে। কারণ ভোক্তারা বিকল্প খুঁজবে। প্রতিবেদন আতঙ্কে গত তিন সপ্তাহে আমাদের ৪০ শতাংশের বেশি বিক্রি কমেছে। আমরা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খামারিরা। তারা দুধ বিক্রি করতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘সমস্যা থাকতেই পারে। তার জন্য সমাধান খুঁজতে হবে। সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বসে এর সমাধানে হাঁটতে হবে। সমস্যার সমাধানে খামারিদের সংগঠনগুলোও বসতে রাজি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। অথচ সংকট দিন দিন বাড়ছে।’

মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (পিপিএম) মুস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আমাদের দুধ পরীক্ষা করে কোনো সমস্যা পাইনি। তাই ভোক্তাদের বলব আতঙ্কিত না হতে। তার পরও সরকার যেহেতু সমস্যার কথা বলছে, তাহলে এর সূত্রপাত কোথায় সেটা খুঁজে বের করুক। সমাধানে বসুক। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। এভাবে একটা একটা করে ভয় ঢুকিয়ে স্থানীয় দুগ্ধ শিল্পকে ক্ষতির মুখে না ফেলে বরং সমাধানের জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি।’

প্রাণ গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৯০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফুটিয়ে পাস্তুরিত দুধ প্রক্রিয়াজাত করা হয়; যেখানে ৭১ ডিগ্রিতে দুধ ফোটালেই কোনো ধরনের দূষণ থাকার কথা নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে বসেছি। কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছি। সব খামারি তো একরকম হয় না। আমরা কৃষকদের নিয়মিত বলছি, সচেতন করছি।’

সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআর, প্লাজমা প্লাস, ওয়াফেন রিসার্চ, পরমাণু শক্তি কমিশন ও আইসিডিডিআরবির ল্যাবে পাস্তুরিত দুধ, খোলা দুধ ও গোখাদ্য পরীক্ষা করে। এই পরীক্ষায় বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত ১৪টি কম্পানির মধ্যে ১১টির পাস্তুরিত দুধে সিসা পাওয়া গেছে। এই কম্পানিগুলো হলো—মিল্ক ভিটা, ডেইরি ফ্রেশ, ইগলু, ফার্ম ফ্রেশ, আফতাব মিল্ক, আল্ট্রা মিল্ক, আড়ং ডেইরি, প্রাণ মিল্ক, আইরান, পিউরা, সেইফ মিল্ক।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) মাহবুব কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কম্পানিগুলোর সঙ্গে এখনো মিটিং হয়নি, তবে দ্রুতই মিটিং ডাকা হবে। তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হবে। এর মধ্যে থাকবে ল্যাবের সক্ষমতা বাড়িয়ে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করা, অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা, খামারিদের সচেতন করতে পদক্ষেপ নেওয়া, গরুতে যাতে অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়া হয় সে ব্যবস্থা নেওয়া, অ্যান্টিবায়োটিক দিলেও নির্দিষ্ট সময়ে যেন তার দুধ বাজারে বিক্রি করা না হয় এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

ভোক্তারা দুধ খাবে না ছেড়ে দেবে—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। একটু সময় দিতে হবে এবং ধৈর্য ধরতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা