kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

বালিশকাণ্ডে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা দেখতে চান হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ জুলাই, ২০১৯ ২০:২৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বালিশকাণ্ডে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা দেখতে চান হাইকোর্ট

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রে আবাসন প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা দেখতে চান হাইকোর্ট। এ জন্য সরকারকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দিয়েছেন আদালত। আগামী ২০ অক্টোবর পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সময় আবেদনে এ আদেশ দেন আদালত। 

বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ রবিবার এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম। রিট আবেদনকারী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন নিজেই শুনানি করেন। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এরমধ্যে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন-২) মো. মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে সাত সদস্যের এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. মঈনুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ৯ হাজার টাকার দুর্নীতির প্রমান পায়। এই কমিটি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। 

সুপারিশে বলা হয়েছে, দায়ী কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দায়িত্বের গুরুত্ব অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা/ প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রথমে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়। এই প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করার জন্য গত ১৫ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। আজই এই প্রতিবেদনের ওপর শুনানি হয়। 

আজ শুনানিকালে রিট আবেদনকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বলেন, রিপোর্টে ৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার দুর্নীতি ধরা পড়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসময় আদালত তার কাছে জানতে চান, এই তদন্তে তিনি সন্তুষ্ট কী না? কোনো আপত্তি আছে কী না? জবাবে সায়েদুল হক সুমন বলেন, সন্তুষ্ট। তবে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, এখানে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে শুধুই বিভাগীয় ব্যবস্থা নিলে হবে না। এটা স্পর্শকাতর বিষয়। তাই তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।  

এসময় আদালত বলেন, সরকার কি ব্যবস্থা নেয় তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করতে চাই। আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, মন্ত্রণালয়ের তদন্তেই ৩৬ কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমান মিলেছে। প্রতিবেদন দিয়েছে। কিন্তু জড়িতদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? 

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালত বলেছেন যে সরকারকে সময় দেওয়া দরকার। আমারও তাই মত। মাত্র প্রতিবেদন পাওয়া গেলো। এখন একটু অপেক্ষা করা দরকার, সরকার কি ব্যবস্থা নেয়। তাই সময় চাচ্ছি। দুইমাস সময় দেয়া হোক। এরমধ্যে দেখি কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর আদালত আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দিয়ে আদেশ দেন।

তদন্ত প্রতিবেদন 
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট নয়টি ভবনের জন্য করা টেন্ডারের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মালামালের দাম ধরা হয় দুইশ ৩১ কোটি ৪৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। কিন্তু এসব মালামালের প্রকৃত মূল্য (বাজার মূল্য) একশ ৬৯ কোটি ২৭ লাখ ৬ হাজার টাকা। এই নয়টি ভবনে অনিয়ম ধরা পড়েছে ৬২ কোটি ২০ লাখ ৮৯ হাজার টাকার। এরমধ্যে ৫টি ভবনে মালামাল সরবরাহ না করায় ওই ৫টি ভবনের মালামালের জন্য এখনও কোনো টাকা পরিশোধ করা হয়নি। শুধুমাত্র চারটি ভবনে মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। এই চারটি ভবনে সরবরাহ করা মালামালের প্রকৃত মূল্য ৭৭ কোটি ২২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। কিন্তু তাদের দেওয়া হয়েছে একশ ১৩ কোটি ৬২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। তাই অতিরিক্ত ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ৯ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত দেওয়া টাকা ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচ্য ব্যয় প্রাক্কলনসমুহের অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি সম্পর্কে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করে সুপারিশ সহকারে চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রাজশাহী জোনে পাঠায়। এক্ষেত্রে রাজশাহী ও পাবনা সার্কেলের নি¤œলিখিত কর্মকর্তারা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেননি। প্রতিবেদনে কে কোন বিষয়ে দায়িত্বশীল ছিলেন তা বিভাগ ওয়ারি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রাক্কলন প্রস্তুত বা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এক্ষেত্রে দায়ীরা হলেন- পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলম, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তাহাজ্জুদ হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল, উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী  আহম্মেদ সাজ্জাদ খান, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তারেক, সহকারি প্রকৌশলী মো. রুবেল হোসাইন, মো. আমিনুল ইসলাম, উপসহকারি প্রকৌশলী মো. ফজলে হক, সুমন কুমার নন্দী, মো. রফিকুজ্জামান, মো. জাহিদুল কবীর, মো. শাহীন উদ্দিন, মো. আবু সাঈদ ও মো. শফিকুল ইসলাম। 

প্রাক্কলন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সুপারিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় এক্ষেত্রে দায়ীরা হলেন- রাজশাহী সার্কেলের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম জিল্লুর রহমান, পাবনা সার্কেলের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেবাশীষ চন্দ্র সাহা, পাবনা জোনের সহকারি প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম, রাজশাহী গণপূর্তের উপসহকারি প্রকৌশলী খোরশেদা ইয়াছরিবা, খন্দকার মো. আহসানুল হক, পাবনার উপসহকারি প্রকৌশলী সুমন কুমার নন্দী ও পাবনার সহকারি প্রকৌশলী মো. রওশন আলী। 

প্রাক্কলন যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়ী কর্মকর্তারা হলেন- রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুর রহমান ও মো. নজিবর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী তানজিনা শারমিন, মো. নুরুল ইসলাম(এলপিআর), মো. আশরাফুল ইসলাম, সহকারি প্রকৌশলী মো. মকলেছুর রহমান, উপসহকারি প্রকৌশলী শাহনাজ আকতার ও মো. আলমগীর হোসেন। 

বিল প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়ী কর্মকর্তারা হলেন-পাবনা জোনের উপসহকারি প্রকৌশলী মো. শফিউজ্জামান, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তারেক, উপসহকারি প্রকৌশলী মো. জাহিদুল কবীর, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল, উপসহকারি প্রকৌশলী মো. রওশন আলী, মো. রফিকুজ্জামান, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তাহাজ্জুদ হোসেন, উপসহকারি প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আহম্মেদ সাজ্জাদ খান ও নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলম।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিষ্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের করা এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট বিষয়টি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে রুল জারি করেন। রুলে আবাসন প্রকল্পে কেনাকাটা ও কেনা সামগ্রী ওঠাতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষনা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। গণপূর্ত সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকোশলী, রাজশাহীর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী এবং রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালককে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রিনসিটি প্রকল্পের ২০ ও ১৬ তলা ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের জন্য অস্বাভাবিক মূল্যে আসবাবপত্র কেনা ও তা ভবনে উঠানোর খরচ দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। এনিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হবার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 

গত ১৬ মে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে ২০ তলা ১১টি ও ১৬ তলা ৮টি ভবন হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ তলা আটটি ও ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য একটি বৈদ্যুতিক চুলার দাম ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৭শ ৪৭ টাকা এবং তা ভবনে তুলতে খরচ ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬শ ৫০ টাকা, একটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৯ ম ৫৭ টাকা এবং তা ভবনে তুলতে খরচ ধরা হয়েছে ৭শ ৩০ টাকা। একটি বৈদ্যুতিক কেটলির দাম ৫ হাজার ৩শ ১৩ টাকা যা তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৯শ ৪৫ টাকা। একটি টিভির দাম ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৯শ ৭০ টাকা তা ভবনে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৬শ ৩৮ টাকা, এই টিভি রাখার কেবিনেটের দাম ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৩শ ৭৮ টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা