kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অদ্ভুত নালিশে তোলপাড়, অভিযোগ খতিয়ে দেখবে সরকার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ জুলাই, ২০১৯ ০৯:৪৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অদ্ভুত নালিশে তোলপাড়, অভিযোগ খতিয়ে দেখবে সরকার

৩৭ মিলিয়ন বা তিন কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ হওয়ার তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহযোগিতা চেয়েছেন এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধি। তাঁর ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ওই অভিযোগের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘তিনি (প্রিয়া সাহা) কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। তার অভিযোগগুলোও সরকার শুনবে এবং খতিয়ে দেখবে।’

অন্যদিকে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার গতকাল শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেন, তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে গত আট মাসে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় তিনি বলেন, বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য কাজ করছে। এ সময় তিনি আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অংশ হিসেবে গত বুধবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে তিনিও গিয়েছিলেন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তাঁর সেদিনের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্টে বাংলাদেশি ওই নারীকে ‘মিস সাহা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে, তাঁর পুরো নাম প্রিয়া সাহা। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক।

তবে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত গতকাল শুক্রবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, প্রিয়া সাহা তাঁর সংগঠনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওই সম্মেলনে যাননি। প্রিয়া সাহার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ও বক্তব্য তাঁর নিজের। কিন্তু যে কথাগুলো তাঁরা এ দেশে মাঠে-ময়দানে বলছেন, তার সঙ্গে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের কোনো ভিন্নতা তিনি দেখছেন না।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, প্রিয়া সাহার বক্তব্যের একটি শব্দ যেমন ‘ডিসঅ্যাপিয়ার’ নিয়ে তাঁর ভিন্নমত আছে। তিনি বলেন, “ডিসঅ্যাপিয়ার বলতে প্রিয়া সাহা কী বোঝাতে চেয়েছেন আমি জানি না। তবে এটি যদি ‘মিসিং পপুলেশন’ বলা হতো তাহলে আরো সঠিক হতো।”

রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ হয়নি, ‘মিসিং’ হয়েছে। যে শক্তিটি বাংলাদেশ চায়নি, সেই শক্তিটি একাত্তরের মতোই ‘ক্লিনজিং’ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। তারা যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন করে। আর যখন ক্ষমতায় থাকে না, তখন নানা রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশ করে একই কাজ অব্যাহত রাখে।

হোয়াইট হাউস প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রিয়া সাহার নিম্নোক্ত কথোপকথন স্থান পেয়েছে।

মিজ সাহা : স্যার, ধন্যবাদ। স্যার, আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। আর এখানে ৩৭ মিলিয়ন (তিন কোটি ৭০ লাখ) লোক; হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান (অস্পষ্ট)। দয়া করে আমাদের, বাংলাদেশের জনগণকে সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই।

প্রেসিডেন্ট : বাংলাদেশ?

মিজ সাহা : জি। এখনো সেখানে ১৮ মিলিয়ন (এক কোটি ৮০ লাখ) সংখ্যালঘু লোক আছে। আমার অনুরোধ হলো, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ছাড়তে চাই না। শুধু সাহায্য, মিস্টার প্রেসিডেন্ট।

আমি আমার বাড়ি হারিয়েছি। তারা আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা আমাদের জমি নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।

প্রেসিডেন্ট : জমি কে নিয়েছে? বাড়ি ও জমি কে নিয়েছে?

মিজ সাহা : মুসলমান মৌলবাদী গোষ্ঠী। আর তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে সেদিন প্রিয়া সাহার কথোপকথনের যে ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে তাতে অবশ্য প্রিয়া সাহাকে ৩৭ মিলিয়ন লোক; হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ হওয়ার কথা বলতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতিবছর আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তার বাংলাদেশ অংশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল, নির্যাতন-নিপীড়ন, হয়রানির তথ্য স্থান পায়।

এদিকে প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড়ের পটভূমিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার আলম গত রাতে ফেসবুকে লিখেছেন, তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে একাধিকবার মানবাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সেখানে রানা দাশগুপ্তের মতো মানুষরাও ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রিয়া সাহা যেসব অভিযোগ করেছেন তেমন কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন কাউকে করতে দেখেননি তিনি।

তিনি আরো লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে টাম্পও জানেন যে তাঁর কাছেও মিথ্যা অভিযোগ করা হয়। মার্কিন প্রশাসন তাদের এখানকার দূতাবাসের মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত তথ্য পেয়ে থাকে এবং আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগে থাকি।’

প্রিয়া সাহার সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমালোচনা করছেন উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লিখেছেন, এটাও ঠিক নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ। অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে বা না বুঝে এর ক্ষতি করে ফেলেন। সবার উচিত এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনও গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক সম্মেলনে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের যে সংখ্যালঘুরা হারিয়ে গেছেন তাকে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরাও ‘মিসিং পপুলেশন’ বলছেন। ১৯৪৭ সালে এ দেশে হিন্দু ছিল ২৯.৭ শতাংশ। এটি ১৯৭০ সালে ১৯ থেকে ২০ শতাংশে নেমে আসে। সত্তরের নির্বাচনে যারা ভোট দিল তারাই আবার পরে গণহত্যার শিকার হলো।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্বাস্তুদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাদের বাড়িঘর জ্বালানো হলো। যারা পালাতে পারল না, তাদের ধর্মান্তরিত করা হলো।

২০১১ সালের শুমারির পর বলা হলো, হিন্দু ধর্মাবলম্বীর হার ৯.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। আজ থেকে ছয়-সাত মাস আগে আবারও বলা হলো ২ শতাংশ হিন্দু বেড়েছে। সেটি বাড়লেও তা ১১.৭ শতাংশ আছে। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশের আদমশুমারিগুলোর ফল দেখলেই বোঝা যাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন ‘মিসিং’ হয়ে যাচ্ছে, এটি সত্য।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লাখ লাখ একর জমি ‘শত্রু সম্পত্তি’/‘অর্পিত সম্পত্তি’ করা হয়েছে। সরকারি সেসব গেজেটেও দেখানো হয়েছে, সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশে ছিল, পরে ভারতে চলে গেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা