kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

দুদকের প্রতিবেদনে উঠে এল ওয়াসার ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ জুলাই, ২০১৯ ১০:২৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুদকের প্রতিবেদনে উঠে এল ওয়াসার ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র

ফাইল ফটো

ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করার পাশাপাশি এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২টি সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও ব্যয় বাড়ানো হয়। এ কাজে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও জড়িত থাকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের হাতে এসংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে দেন দুদকের কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক খান। দুদকের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে একজন উপপরিচালক এবং একজন সহকারী পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দলটি ওয়াসার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বর্তমান কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিরপুরের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসকরণ প্রকল্পটি ২০১২ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০১৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ

শেষ না করে অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৫২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এ কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৬.৭২ শতাংশ। ঠিকাদারকে এর মধ্যে ৩১৩.৭১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ টাকা সংশোধিত ডিপিপি মূল্যের ৫৪.৭৫ শতাংশ। কাজের অগ্রগতির সঙ্গে ঠিকাদারের পরিশোধিত বিলের পার্থক্য অনেক।

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরে পানি সরবরাহ সচল রাখতে প্রতিদিন ৪০ কোটি লিটার অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করার জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, প্রতিস্থাপন, রিজেনারেশন ও পানির লাইন নির্মাণ এবং পুনর্বাসনের তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৫ সালের মার্চে শুরু হওয়া এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের জুনে। কিন্তু কয়েকটি গভীর নলকূপ স্থাপন ও কিছু পানির লাইন স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। এই প্রকল্পেও কাজের অগ্রগতির তুলনায় ঠিকাদারকে পরিশোধ করা বিলের পার্থক্য রয়েছে। কাজ শেষ করার আগেই কয়েক গুণ বেশি টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন ঠিকাদার। অনুসন্ধানকারী দল জানিয়েছে, এ কাজেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ না করে বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ছিল। এ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়নি।

একইভাবে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেইজ-৩) প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। চার হাজার ৫৯৭ কোটি ব্যয়ের প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে জুনে। কিন্তু কাজটির দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার যশলদিয়ায় পদ্মা নদীর তীরে পানি শোধনাগার নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার মিটফোর্ড, নবাবপুর, লালবাগ, হাজারীবাগ, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর এলাকায় ৪৫০ এমএলডি সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য তিন হাজার ৫০৮ দশমিক ৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পটিও (ফেজ-১) আলোর মুখ দেখছে না। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শেষ হয়নি।

ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পাঁচ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু হয়ে শেষ করার কথা এ বছরের (২০১৯) ডিসেম্বরে। এই প্রকল্পের কাজে দুই হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশান, বনানীসহ অন্যান্য এলাকায় পয়োবর্জ্য পরিশোধন প্রকল্পের জন্য তিন হাজার ৩১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার, আগারগাঁও এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়নসহ ওয়াসার প্রকল্পে যেন দুর্নীতি ও অনিয়ম বাসা বেঁধেছে। বলা হয়, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়ে থাকে। পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়ে এমন কিছু শর্তারোপ করা হয়, যাতে নির্দিষ্টসংখ্যক ঠিকাদার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি ও রাজনৈতিক পরিচয় এবং কাজ পাওয়ার বিনিময়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতিও খুঁজে পেয়েছে অনুসন্ধানদল। ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসা এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করায় প্রকৌশল ও রাজস্ব শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

ওয়াসায় জনবলসংকটের কারণে নিয়োজিত কর্মচারীদের ওভারটাইম বিল বেতনের চেয়ে দ্বিগুণ বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রভাবশালী কর্মচারী ওভারটাইম না করেও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ওভারটাইম বিল উত্তোলন করে আসছেন। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২টি সুপারিশ করেছে দুদকের দল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা