kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

ধর্ষণ মামলার বিচার তাড়াতাড়ি হবে না, এটা হতাশাজনক : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ২১:১৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ধর্ষণ মামলার বিচার তাড়াতাড়ি হবে না, এটা হতাশাজনক : হাইকোর্ট

ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলার বিচার আইনে নির্ধারিত ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্ট সাতদফা নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, আইন সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছে। 

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন। পৃথক তিনটি ধর্ষণ মামলার চার আসামির জামিন আবেদনের ওপর আদেশ দেওয়ার সময় আদালত এই নির্দেশনা দিয়েছেন। 

আদালত বলেন, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হবে আর সেই মামলার বিচার তাড়াতাড়ি হবে না, এটা হতাশাজনক ও দুঃখজনক। 

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারলে সুপ্রিম কোর্টকে তা অবহিত করার বিধান থাকলেও নিম্ন আদালতের বিচারক ও সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তার (পিপি) সুপ্রিম কোর্টকে না জানানোয় হাইকোর্ট ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

আদালত বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে বিচারকদের। কিন্তু তা তারা করছেন না। এ কারণে এর আগে আমরা একটি আদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও তারা সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করছে না।

আদালত বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি কোনো বিচারকের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয় তবে দেখা যায়, তারা সরাসরি চলে আসেন। মন্ত্রণালয়ে তদবির করেন। তারা হাইকোর্টের কাছে জবাবদিহী করতে চান না। মনে হয়, তারা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকতে পছন্দ করেন। অথচ বিচার বিভাগ পৃথককরণের উদ্দেশ্য কি ছিল?

হাইকোর্টের সাতদফা নির্দেশনা দেওয়ার আদেশের কিছুক্ষন পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থিত হন। সেসময় আদালত আদেশের তথ্য অ্যাটর্নি জেনারেলকে অবহিত করেন। 

এসময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এসব ধরণের ঘটনা তাৎক্ষনিকভাবে বিচারের জন্য একজন বিচারক স্ট্যান্ডবাই থাকবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর ভিকটিমকে মেডিকেল অফিসারের কাছে তিনি নিয়ে যাবেন। এরপর রিপোর্টের ভিত্তিতে তাৎক্ষনিক বিচার করে ফেলতে হবে। দ্রুত বিচার ছাড়া এ জাতীয় প্রবণতা কমানো যাবে না। 

আদালত বলেন, একটি ইয়ং মেয়ে বা শিশু ভিকটিম হবে। আর বিচার বিলম্বিত হবে তা হতে পারে না। ভিকটিমেরতো একটা ভবিষ্যত রয়েছে।  অ্যাটর্নি জেনারেলের উল্লেখিত মন্তব্যেল পর আদালত বিচারকদের অনিহা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন হাইকোর্ট।

এই আদেশের পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ধর্ষণের মামলা আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হওয়ায় হাইকোর্ট ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, নির্দেশ দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না। ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এলাকায় এলাকায় কমিটি গঠন করতে হবে। ধর্ষণের বিচার খুবই দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

হাইকোর্টের সাতদফা নির্দেশনা হলো-
১. দেশের নারী ও শিশু র্যিাতন দমন ট্রাইব্যুনালসমূহে বিচারাধীন ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনের নির্ধারিত সময়সীমার (বিচারের জন্য মামলা পাপ্তির তারিখ হতে ১৮০ দিন) মধ্যে যাতে বিচারকাজ সম্পন্ন করা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

২. ট্রাইব্যুনালসমূহকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ধারা ২০ এর বিধান অনুযায়ী মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে। 

৩. ধার্য তারিখে সাক্ষি উপস্থিতি ও সাক্ষিদের নিরাপতআ নিশ্চিত করার লক্ষে প্রতি জেলায় অতিরিক্তি জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবেন এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট, স্বারাষ্ট্র ও আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। যে সমস্ত জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল রয়েছে সে সমস্ত জেলায় সকল ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরগণ মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হবেন এবং তাদের মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠ তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।

৪. ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সঙ্গত কারণ ছাড়া সাক্ষিকে আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করতে হবে।

৫. মনিটরিং কমিটি সাক্ষিদের উপর দ্রুততম সময়ে যাতে সমন জারি করা যায় সে বিষয়েও মনিটরিং করবেন। 

৬. ধার্য তারিখে সমন পাওয়ার পরও অফিসিয়াল সাক্ষিগণ যেমন- ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞগণ সন্তোষজনক কারণ ব্যতিরেকে সাক্ষ্য প্রদানে উপস্থিত না হলে, ট্রাইব্যুনাল উক্ত সাক্ষিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ প্রদান বিবেচনা করবেন;

৭. আদালতের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, অবিলম্বে সাক্ষি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং আদালত এটাও প্রত্যাশা করছে যে, সরকার অতি স্বল্প সময়ে উক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবেন।

নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অত্র আদেশের কপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, আইন সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা