kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

বন্যায় ১১ জেলার তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ জুলাই, ২০১৯ ০৮:২৮ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বন্যায় ১১ জেলার তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি

ভারি বর্ষণের কারণে ১০ জেলায় নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এসব জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এ পর্যন্ত বন্যাকবলিত ১১টি জেলায় তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তলিয়ে গেছে ফসল, গ্রামীণ সড়ক। বন্ধ হয়ে গেছে তিন শতাধিক বিদ্যালয়। এরই মধ্যে দুর্গতদের জন্য ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা : গতকাল সচিবালয়ে আন্ত মন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির এক সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, তাতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এ অবস্থায় দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার ও নীলফামারী জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দেশের নদ-নদীগুলোর ৬২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে যমুনা নদীতে পানি আরো বাড়বে। পাশাপাশি বিহারে গঙ্গার পানি বাড়ায় বালাদেশে পদ্মা অববাহিকায় বন্যা দেখা দিতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, দুর্গত জেলাগুলোতে পাঠানো হয়েছে সাড়ে ১৭ হাজার মেট্রিক টন চাল, ৫০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং দুই কোটি ৯৩ লাখ টাকা। দু-এক দিনের মধ্যে এসব জেলায় ৫০০টি করে তাঁবু এবং মেডিক্যাল টিম পাঠানো হবে। তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যাতে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে সব ধরনের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সিভিল সার্জনদের নেতৃত্বে টিম গঠন করা হয়েছে, যাতে পানিবাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা যায়। খাদ্যগুদামে কর্মরতদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ত্রাণসচিব শাহ কামাল বলেন, যেসব জেলা দুর্গত হতে পারে সেগুলোর পাশাপাশি অন্য জেলাগুলোতেও সমান প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

নদ-নদীর পানি বাড়ছে : ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারাসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদীর পানি বেড়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, সারা দেশে তাদের পর্যবেক্ষণে ৯৩টি পানির সমতল স্টেশন আছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৭টি সমতল স্টেশনের পানি বেড়েছে। সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, সাঙ্গু ও তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও লালমনিরহাট জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

জানতে চাইলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা পানি ও দেশে ভারি বর্ষণের কারণে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগামী দুই দিন নদ-নদীতে পানি আরো বাড়বে। কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।’

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ভারতে ভারি বর্ষণে চাপ পড়েছে বাংলাদেশের নদ-নদীর ওপর। যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্ট, গাইবান্ধার ফুলছড়ি পয়েন্ট ও তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি এরই মধ্যে বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে।

গত রাত ৯টার দিকে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সন্ধ্যা ৬টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বালাসীঘাট পয়েন্টে ৪৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের বুড়ি তিস্তা, দেওনাই, চাড়ালকাটা, খড়খড়িয়া, যমুনেশ্বরীর পানি বাড়ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, সিলেটের কানাইঘাট স্টেশনে সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। সুনামগঞ্জ অংশে ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। দোহাজারী স্টেশনে সাঙ্গু নদীর পানি বিপত্সীমার ৯২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট ও হবিগঞ্জে কুশিয়ারার পানিও বিপত্সীমার ওপরে রয়েছে। তিস্তায় পানি বাড়ায় রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বাড়ায় সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বেশ কয়েকটি এলাকা তলিয়ে গেছে।

তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি : বন্যার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলাসহ ১১ জেলায় তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। এর মধ্যে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পার্বত্য বান্দরবান জেলায় দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তা তীরবর্তী ৩৩টি গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার। বিশেষ করে চরাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, আদিতমারী ও সদর উপজেলার সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলায় তিস্তার চরাঞ্চলের প্রায় ১৫টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ৪০টি গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বান্দরবান ও লামা পৌর এলাকার বেশির ভাগই প্লাবিত। প্রায় দেড় লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে আছে গত কয়েক দিন। জেলা ও লামা উপজেলা প্রশাসনের খোলা ১২৬টি আশ্রয় শিবিরে কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় টানা বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সাত ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল ভোররাতে নদীর পানির চাপে বাঘগুজারা রাবার ড্যামের (ব্যারাজ) পাশে বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে এসব ইউনিয়নে পানি ঢুকে পড়ে। এতে এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ১০ হাজার পরিবারের মাঝে ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ বিতরণ করেছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী। এ ছাড়া গতকাল পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন ৪০ মেট্রিক টন চাল ও দুই হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দিয়েছে।

চট্টগ্রামের রাউজানে ডাবুয়া খালের বেঁড়িবাধ ভেঙে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক শ পরিবার। ফটিকছড়ি উপজেলায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। বন্যার্তদের জন্য ৫০০ কেজি চাল ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারা বাজার ও ধর্মপাশা উপজেলার নিশ্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ১৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হওয়ার কথা বলা হলেও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন অন্তত ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি।

সিলেট শহরতলির খাদিমনগর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১০০টির বেশি গ্রামের মানুষ। গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন ও সারী নদীর পানি বেড়ে উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

হবিগঞ্জে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে শহরের কয়েকটি এলাকা। এ ছাড়া চুনারুঘাট, বাহুবল ও নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ।

শেরপুরের ঝিনাইগাতি তিন ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মালিঝিকান্দা, হাতিবান্দা ও গৌরীপুর ইউনিয়নে অবনতি হয়েছে। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। শ্রীবরদী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি এক হাজার পরিবার।

বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি : প্লাবিত এলাকার অনেকগুলোতেই সড়ক তলিয়ে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বান্দরবানে। এ ছাড়া গবাদি পশুর খাবারের সংকটও দেখা দিয়েছে বন্যাকবলিত অঞ্চলে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ফসলের।

বান্দরবানে যাওয়া-আসার একমাত্র সড়ক বান্দরবান-কেরানির হাট সড়ক গতকালও ছিল তিন ফুট পানির নিচে। পাহাড়ধসের কারণে অন্য পথগুলোও ছিল অচল। কক্সবাজারের চকরিয়ার সাত ইউনিয়নে অন্তত ১০ হাজার একর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গ্রামগুলোর কাঁচা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজি, পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের ৬২১টি পুকুরের দুই কোটি ৬২ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিমুল হক। ঢল ও বৃষ্টিতে এ উপজেলাগুলোর প্রধান সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরের সঙ্গে কয়েকটি ইউনিয়নের যোগাযোগের একমাত্র সড়কের অন্তত ৩০ ফুট ভেঙে গেছে পানির তোড়ে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পাথরকোয়ারি ভোলাগঞ্জ এবং গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি ও জাফলং পাথরকোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রায় ৩০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ : সুনামগঞ্জে ২৩৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্যগুলো মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ৬০টি বিদ্যালয় ও গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তত ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। লালমনিরহাটের বন্যাকবলিত তিন উপজেলার ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে গতকাল পাঠদান বন্ধ ছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা