kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ১০ বছরে বরাদ্দ বেড়েছে ৪ গুণ, তবু বিপর্যয়

পার্থ সারথি দাস   

২৪ জুন, ২০১৯ ১১:১৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ১০ বছরে বরাদ্দ বেড়েছে ৪ গুণ, তবু বিপর্যয়

ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বর থেকে পোস্ট অফিস মোড় পর্যন্ত সড়কটি ২৮৫ মিটার দীর্ঘ। এক বছর ধরে সড়কটিতে খানাখন্দ বাড়তে থাকে। এটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের অধীন। জনপ্রতিনিধিরা বারবার তাগিদ দিলেও চলতি অর্থবছরের ১০ মাসেও এটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি সড়ক বিভাগ। শেষ পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ শহরবাসীর দাবির মুখে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়র নিজেরাই মেরামতের কাজে হাত লাগান। পিচসহ পাথর ঢেলে তা সমান করতে রোলারের স্টিয়ারিং ধরেন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ। তাঁকে সহায়তা করেন মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু। পোস্ট অফিস মোড়, সুইট হোটেলের সামনের অংশ ও বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে মেরামতকাজ করান তাঁরা। ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগ তখনো হাত গুটিয়ে।

খোঁজ নিলে ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম গত শনিবার কালের কণ্ঠকে জানান, পায়রা চত্বর থেকে পোস্ট অফিস অংশ রক্ষণাবেক্ষণে গত ২০ মে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছে। রবিবার (গতকাল) থেকে কাজ শুরু করবে মোজাহার এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠান। তাতে ব্যয় হবে ১৪ লাখ টাকা। কাজ শেষ হবে ২৭ জুন। কেন এত দেরিতে কাজ শুরু করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আরো প্রকল্পের কাজের জন্য এই কাজে দেরি হয়েছে।’

জানা গেছে, বরাদ্দ বাড়লেও সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের গাফিলতি ও ঠিকাদারদের কারসাজিতে জরুরিভাবে সড়ক মেরামত হচ্ছে না বিভিন্ন সড়ক বিভাগে। আবার মেরামত করা হলেও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে বছর না ঘুরতেই যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রকৌশলীরা দরপত্র ও বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং বৈরী আবহাওয়ার অজুহাত তুলে দায় সারতে চেষ্টা করেন। বিভিন্ন অজুহাত তুলে অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে জরুরি কাজের দরপত্র আহ্বান করেন। এর মাসুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা তদারকি ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করেছেন। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, প্রকৃতপক্ষে মাঠে তদারকি থাকা দরকার।

সওজ বলছে চাহিদার এক-চতুর্থাংশও পায় না, বাস্তবে বরাদ্দ বাড়ছে : সওজ অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরে সড়ক সংস্কারে চাহিদা ছিল ৫৫ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা, যা চাহিদার এক-চতুর্থাংশেরও কম। কিন্তু তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সড়কে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ প্রতি অর্থবছরই বাড়ছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ জন্য বরাদ্দ আছে দুই হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে হচ্ছে দুই হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।

প্রায় ১০ বছর আগে ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা ছিল ৬১০ কোটি টাকা, ২০১০-১১ সালে বেড়ে হয় ৬৬৭ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে আরো বেড়ে হয় ৭০৪ কোটি, ২০১২-১৩ সালে বেড়ে হয় এক হাজার ১৩৫ কোটি, ২০১৩-১৪ সালে এক হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৪৪৪ কোটি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৪৬৮ কোটি ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আরো বেড়ে হয় এক হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।  

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অচল সেতু সংস্কার না করায় : একটি জরাজীর্ণ সেতু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বড় যানবাহনের সরাসরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ছয় দিন ধরে চলছে এ অবস্থা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরে তিতাস নদের জরাজীর্ণ সেতুর একাংশ ভেঙে গেছে। এ কারণে চান্দুরা-আখাউড়া-ঢাকা এবং রতনপুর-ছাতিয়াইন-নাসিরনগর-বিশ্বরোড হয়ে ঢাকায় চলাচল করছে জরুরি যানবাহন। পণ্যবাহী ট্রাক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়ে আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেইলি সেতু আনা হয়েছে। তিন-চার দিনের মধ্যে যাত্রী নামিয়ে বাস চালানো সম্ভব হবে।’ তিনি জানান, ভেঙে পড়া সেতুটি ১৯৭০ সালের আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। এই সেতুর পাশে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ ৮৫ শতাংশ এগিয়েছে। ব্যয় হচ্ছে ৫৯ কোটি টাকা। মেসার্স জামিল ইকবাল নামের প্রতিষ্ঠানটি নতুন সেতু নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল বলে তিনি জানান। এর পরও বিদ্যমান সেতুর ফুটপাত ও রেলিং ভেঙে যায়। স্থানীয়রা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লেও বিদ্যমান সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে সড়ক বিভাগ গুরুত্ব দেয়নি।

এক বছর না ঘুরতেই ফুলে উঠছে মহাসড়ক : এ-ও দেখা গেছে, কোটি কোটি টাকা খরচ করার পরও সড়ক যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তার উদাহরণ কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়ক। এই মহাসড়কের ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে সাড়ে ২৬ কিলোমিটার দুই অংশে ভাগ করে উন্নয়ন করা হয়েছে। ব্যয় হয়েছে ৪৩ কোটি টাকা। তবে বছর না ঘুরতেই এটি অনুপযোগী হয়ে আছে। জানা গেছে, নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করায় মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ফুলে উঠেছে। তাতে ছোট যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বেড়েছে দুর্ঘটনা।

কুষ্টিয়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, গত ঈদুল ফিতরের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করার কথা ছিল। তা সম্ভব হয়নি। তবে ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে। কেন এক বছর যেতে না যেতেই মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলো জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি শুধু বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দুই-তিন বছর পর হালকা মেরামত, ৫-১০ বছর পর ভারী মেরামত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর জরুরি মেরামত—এই চার ধাপে সড়ক মেরামত করার জন্য বরাদ্দ থাকে। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বিভিন্ন সড়কে যোগাযোগ বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা