kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

বিপুল বিনিয়োগেও গতি বাড়েনি রেলে

পার্থ সারথি দাস    

১৯ জুন, ২০১৯ ০৯:০৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিপুল বিনিয়োগেও গতি বাড়েনি রেলে

বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সড়কপ্রধান পরিবহনব্যবস্থায় প্রাণহানি বাড়ায় নিরাপদ যাতায়াতের জন্য যাত্রীরা রেলের দিকেই ঝুঁকছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় বিনিয়োগহীন রেল খাত ধুঁকতে ধুঁকতে জীর্ণদশায় পড়ে। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ১০ বছরে রেল খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে। রেল খাতে ১০ বছরের জন্য ৮১টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। সোয়া লাখ কোটি টাকার ৪৮টি প্রকল্পের কাজ চলছে। এ সময়ে বিপুল বিনিয়োগ হলেও গতি আসেনি ট্রেনে। তবে রেলপথমন্ত্রী থেকে শুরু করে রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সব রেলপথ ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন হলে এবং ইঞ্জিন-বগির সংকট দূর হলে রেলে গতি আসবে।

সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ। রেলওয়ের পরিকল্পনা শাখা থেকে জানা গেছে, টঙ্গী-ভৈরব ও লাকসাম-চিনকি আস্তানা ডাবল লাইন বা দ্বৈত পথ করা হয়েছে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে। তবে যাত্রীরা বলছে, ট্রেন চলছে আগের চেয়ে কম গতিতে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যানুসারে, ২০০১ সালে ওই রেলপথে ৮০ কিলোমিটার গতিবেগ ছিল ট্রেনের; এখন ৬৫ কিলোমিটারের কম। আখাউড়া-লাকসাম দ্বৈত পথ প্রকল্পের জন্য এই গতি আরো কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের নিয়মিত যাত্রী শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০০ সালে ঢাকা থেকে যেতে পাঁচ ঘণ্টার কম সময় লাগত। এখন বিরতিহীন ‘সোনার বাংলা’ ট্রেনেও পাঁচ ঘণ্টার বেশি লাগছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথে ট্রেন চলে ৫০ কিলোমিটারের কম গতিতে। ২০১৩ সালে ওই রেলপথ সংস্কার করা হয়েছিল ১৮০ কোটি টাকায়। বলা হয়েছিল, প্রকল্প শেষে রেলপথে ৬৫ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চলবে। বাস্তবে তা হয়নি।

ট্রেন প্রায়ই আটকে থাকে টঙ্গীতে : সিলেট থেকে ঢাকার কমলাপুরে ঢোকার আগে পারাবত ট্রেন রাতে প্রায়ই আটকে থাকে টঙ্গীতে। তারপর গতি এত কমে যে টঙ্গী থেকে কমলাপুর আসতে পৌনে এক ঘণ্টাও লেগে যায়।

গতি না বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ মিটার গেজ। এটি ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন হলে গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার হবে। এটি ছাড়াও বেশির ভাগ রেলপথ মিটার গেজ। রেলপথে বিরতিহীন ছাড়া অন্য সব ট্রেনের বিরতি স্থান বেশি। রাজনৈতিক কারণেও বিরতি স্থান বাড়াতে হচ্ছে। ফলে প্রকল্পে ট্রেনের গতি বাড়ানোর কথা বলা হলেও তা বাড়ানো যাচ্ছে না। রেলওয়ের মহাপরিচালক আরো বলেন, অনেক রেলস্টেশন বন্ধ, স্টেশন মাস্টারও নেই। এসব স্টেশনের আগে-পরে ট্রেনের গতি ১৬ কিলোমিটারের বেশি বাড়ানো যায় না। দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া ক্রসিংও বেশি। ঢাকায় ঢুকতে গেলে টঙ্গী থেকে ট্রেনের গতি কমাতে হয়। তাঁর দাবি, রেলপথ উন্নয়নের সব প্রকল্প শেষ হলে গতি আসবে।

মিটার গেজ শুধু নয়, ব্রড গেজ রেলপথেও ট্রেনের গতি কমছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্রড গেজ রেলপথের কোচ আমদানির পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এগুলো ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলবে। তবে সক্ষমতা নেই বলে পশ্চিমাঞ্চলে ব্রড গেজ রেলপথে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার থেকে ৮৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, উন্নত রেলকোচ এলে ১৪০ কিমি গতিবেগে ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ৩২৫ কিলোমিটার রেলপথের ২৪৯ কিলোমিটার ডাবল করা হয়েছে। রেলপথের ১১৮ কিলোমিটার আগেই ‘ডাবল’ ছিল। ২০১১ সালে টঙ্গী-ভৈরববাজার ৬৪ কিলোমিটার এবং পরে লাকসাম-চিনকি আস্তানা ৭১ কিলোমিটার ডাবল লাইন করা হয়। তাতে ব্যয় হয় প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এখন আখাউড়া থেকে লাকসাম ৭২ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। পুরো রেলপথ ডাবল ও ডুয়াল গেজ হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সোয়া তিন ঘণ্টা লাগবে বলে প্রতিশ্রুতি রয়েছে রেলের। প্রকল্প এলাকায় কাজের স্বার্থে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেনের গতি আরো কমিয়ে যাতায়াত সময় ৪৫ মিনিট বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রকল্প কার্যালয় থেকে।

‘প্রকল্পের কাজের স্বার্থেই গতি কমাতে হচ্ছে’ : আগামী বছরের নভেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি আছে। তবে প্রকল্প পরিচালক ডি এন মজুমদার বলেন, বিভিন্ন কাজ বাড়ায় প্রকল্পের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে। তিনি জানান, প্রকল্পের কাজের স্বার্থেই প্রকল্প এলাকায় ট্রেনের গতি কমাতেই হচ্ছে। জানা গেছে, প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ছয় হাজার ৫০৪ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে ১৬৯ শতাংশ মাটি ভরাট করায় প্রকল্পের ব্যয় ১০০ কোটি টাকা বেড়ে যাবে। এ পর্যন্ত ৬২ শতাংশ কাজ হয়েছে।

রেলওয়ের প্রকল্পবিষয়ক সর্বশেষ (গত মে মাসের) অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমানে এক লাখ ২৫ হাজার ১৮১ কোটি টাকার ৪৮টি প্রকল্প রয়েছে রেলের। অর্ধেক প্রকল্পেই ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে বা বাড়ানো হয়েছে। কোনো কোনোটির ব্যয় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। দেখা যাচ্ছে, বিপুল বিনিয়োগ হলেও সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সময়ে সুফল মিলছে না। এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘শুধু বিনিয়োগ করলেই হবে না। যথাযথ সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রেলওয়েকে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বাড়াতে হবে তদারকিও। সুফল নিশ্চিত না করলে প্রকল্প নিয়ে কাজ হবে না।’

জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ১০ বছরে সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয় প্রায় ৯৯ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রেলের উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৫৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে রেল খাতে বরাদ্দ আছে ১১ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১৬ হাজার ৩৫৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০১৬ থেকে ২০৪৫ সালের মধ্যে রেল খাতের উন্নয়নে সরকার পাঁচ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা খরচ করবে ২৩০টি প্রকল্পে। আগামী অর্থবছরে এক হাজার ১১০ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ ডাবল রেল ট্র্যাক, ৫২ কিলোমিটার নতুন রেল ট্র্যাক নির্মাণ; ১০০ ইঞ্জিন, ১২০টি যাত্রীবাহী কোচ ক্রয় এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে রেলের।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের র‌্যাংকিংয়ে ২০১১-১২ সালে বাংলাদেশের রেল অবকাঠামোর উন্নয়নের দিক থেকে অবস্থান ছিল ১৪২টি দেশের মধ্যে ৭৩তম। পাঁচ বছরের মাথায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের অবস্থান ৬০তম। অর্থাৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। রেলওয়ের তথ্যানুসারে, দুই হাজার ৯২৯ কিলোমিটার রেলপথের ৭৪.৭৭ শতাংশই মানহীন। ২৭৮টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫টিরই আয়ু শেষ হয়েছে। যাত্রীবাহী এক হাজার ৬৫৬টি কোচের মধ্যে ৯০০ বগির আয়ু শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক তাফাজ্জল হোসেন বলেন, নতুন বগি ও ইঞ্জিন আনতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা-টঙ্গী, ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে লাইন বাড়াতে হবে।

ভারত থেকে ইঞ্জিন আনার চেষ্টা : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেলের জন্য আড়াই শ বগি কেনা হবে। এর মধ্যে ব্রড গেজে চালানোর ৫০টি বগি এসেছে। তার মধ্যে দুটি ট্রেন ঢাকা থেকে রাজশাহী ও পঞ্চগড় রুটে চালু করা হয়েছে। আরেকটি আগামী মাসের মধ্যে ঢাকা-দর্শনা রুটে চালু করা হবে। মিটার গেজে চালাতে আনা হবে আরো ২০০ বগি। নতুন ইঞ্জিন আসবে ৭০টি। এগুলো আসতে একটু সময় লাগবে। গতকাল (সোমবার) ভারতে আমাদের প্রতিনিধিদল গেছে, যাতে ভারত থেকে ২০টি ইঞ্জিন কোনো শর্তে আনা যায়।’

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন অবশ্য বলে আসছেন, যেসব এলাকায় রেলপথ নেই, সেখানে রেলপথ সম্প্রসারণ, সব রেলপথকে ব্রড গেজে রূপান্তরিত করা হবে। সব লাইনে ডুয়াল গেজ রাখার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা