kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

বাজেট ও ব্যাংক খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ

সজীব হোম রায়    

১৯ জুন, ২০১৯ ০৮:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাজেট ও ব্যাংক খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি অর্থায়ন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, ভ্যাট আইন, সঞ্চয়পত্র ও কালো টাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রশ্নের মুখে পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ভ্যাট আহরণে একাধিক হার, সঞ্চয়পত্রে উেস কর, কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

এশিয়া এবং প্যাসিফিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডাইসাকু কিহারার (ডিকে) নেতৃত্বে সংস্থার আর্টিক্যাল-৪ এর ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকা সফর করছে। দলটি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে দলটি। অর্থ বিভাগের সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা, মূলধন ঘাটতি পূরণ, বিশেষ নিরীক্ষা নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, আইএমএফের সফর একটি নিয়মিত কার্যক্রম। বৈঠকও তাই। নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আইএমএফের আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে সংস্থার পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। সে অনুযায়ী উত্তর দেওয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের প্রধান ডাইসাকু কিহারা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে জানতে চান। প্রথমেই জানতে চাওয়া হয় বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। বৈঠকে বলা হয়েছে, প্রতি অর্থবছর বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণও হয় বিশাল। তার পরও কেন অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়? চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি পেছনে পড়ে আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। বলা হয়েছে, ঘাটতি মেটাতে প্রধান ভরসা ধরা হয়েছে ব্যাংক ঋণ। অথচ দেশের ব্যাংক খাত নাজুক। চলছে তারল্য সংকট। ব্যাংকের ঋণকে প্রধান ভরসা হিসেবে ধরার কারণে ব্যাংক খাত আরো চাপে পড়বে কি না তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা নাজুক, শেয়ারবাজারও অস্থিতিশীল। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের সঞ্চয়ের অন্যতম ভরসার খাত সঞ্চয়পত্র। অথচ বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর ১০ শতাংশ উেস কর কাটার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে করের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা থেকে কেন নিতে হবে? বিশেষত যে জায়গায় শুধু নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরা নিজেদের সর্বস্ব রাখে। বাজেট পাসের সময় বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ করেছে আইএমএফ।

বর্ধিত ঋণ কর্মসূচির (ইসিএফ) শুরু থেকেই ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে চাপ দিয়ে আসছিল আইএমএফ। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ইসিএফ চুক্তি নেই। তার পরও ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে সংস্থাটির প্রবল আগ্রহ। বৈঠকে ভ্যাট আইনের খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া হয়। বহুস্তরবিশিষ্ট ভ্যাট আইনের ব্যাপারে সংস্থার প্রতিনিধিদলটি বলেছে, একাধিক স্তর হওয়াতে এতে ট্যাক্স অন ট্যাক্স হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে। প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এসব বিষয়কে ছাপিয়ে সংস্থার অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রস্তাবিত বাজেটের কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে। অতীত ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বলেছে, এতে কতটুকু বিনিয়োগ আসবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বানও জানানো হয় বলে জানা গেছে।

এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ। সংস্থাটি খেলাপি ঋণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বৈঠকে বলা হয়, খেলাপি ঋণ না কমা মানে সুশাসনের ঘাটতি থাকা। এর মধ্যে আবার ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে ভালো ঋণগ্রহীতারাও ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত হবে। এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এ সুবিধা আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। আইএমএফ চলতি অর্থবছরে আবার করের টাকায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ হচ্ছে কি না তাও জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে জোর দেওয়ার কথা বলেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা