kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

বিশেষজ্ঞ রাশেদা কে চৌধুরীর মত

বরাদ্দে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ জুন, ২০১৯ ০৯:৩০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বরাদ্দে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি

আমাদের প্রত্যাশা ছিল অন্তত সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়বে। কিন্তু আমাদের সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। চলতি অর্থবছরের চেয়ে মাত্র ০.২৭ শতাংশ বেড়েছে, যদিও বলা হচ্ছে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা খাত নয়, শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলিয়ে এই বরাদ্দ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও খুবই প্রয়োজন। কিন্তু যেটি দরকার, সেটি হচ্ছে শিক্ষাকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে সেটির বরাদ্দকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। এটি আমাদের জাতীয় প্রত্যাশা বলেও মনে করি।

বাজেটে বরাদ্দ সরকারের জন্য কঠিন কাজ। বিভিন্ন খাতে টানাপড়েন থাকে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক ও পরিবহন, পদ্মা সেতু—সব কিছুই প্রয়োজন। কোনোটিকে বাদ দিয়ে কোনোটি নয়। কিন্তু অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে মানবসভ্যতা বিনির্মাণের তো কোনো বিকল্প নেই। আমাদের অবকাঠামো ভেঙে গেলে মেরামত করা সম্ভব। সেটি যেকোনো প্রজন্ম করতে পারবে। কিন্তু শিক্ষায় যদি আমরা যথাযথ বিনিয়োগ না করি, একটি প্রজন্ম যদি ঠিকমতো গড়ে না ওঠে, সেটি তো আর মেরামত করা সম্ভব হবে না। এই জায়গাটি চিন্তা করে বরাবরই আমাদের দাবি ছিল, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বা বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। শিক্ষানীতিতে বলা ছিল ন্যূনতম ২০ শতাংশ বা জিডিপির ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার কথা। তবে সেটি ধাপে ধাপে বলা হয়েছিল। শিক্ষানীতি ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয়। প্রণয়ন কমিটি একটি রোডম্যাপ করে দেখিয়েছিল, ২০১৮ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বিনিয়োগ করা সম্ভব। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ৯ বছর হয়ে গেলেও সেটি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আশা করি, বরাদ্দটা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে যত শিগগির সম্ভব মানবসক্ষমতা বিনির্মাণে শিক্ষায় আরো বেশি করে বিনিয়োগ করা হবে।

তবে বরাদ্দ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও যথাযথ ব্যবহার নিয়ে সব সময়ই একটি প্রশ্ন থাকে। বরাদ্দের অপব্যবহার যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আগামী অর্থবছরে নতুন এমপিওর জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা শিক্ষকদের জন্য অবশ্যই একটি প্রণোদনা। অর্থনীতির চালিকাশক্তি ব্যবসায়ীদের যদি প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে অর্থনীতির পেছনে যাঁরা কাজ করবেন সেই শিক্ষকদের জন্যও প্রণোদনা তো থাকতেই হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই প্রণোদনা যথোপযুক্ত স্থানে যথাযথভাবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাবে কি না? এমপিওভুক্তিতে যেসব প্রতিষ্ঠান আসবে সেই তালিকাটি স্বচ্ছতার সঙ্গে, কতখানি প্রাপ্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হবে, সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমান সরকারের বড় অঙ্গীকার ছিল সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো। এটি শুধু সামাজিক সুরক্ষা খাত দিয়ে হবে না। শিক্ষাক্ষেত্রে যে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে, শিক্ষা যে ক্রমাগত পণ্য হয়ে উঠছে, তা রোধ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে যদি রাষ্ট্র পিছু হটে এবং শিক্ষার ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণে যদি লাগাম টানতে না পারে, তাহলে কিন্তু নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে। আমরা দেখতে পারছি, শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের চেয়ে ব্যক্তি বিনিয়োগ অনেক বেশি। অথচ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেশি করলে যে ভালো ফল পাওয়া যায়, তার প্রমাণ তো ক্যাডেট কলেজ। ক্যাডেট কলেজে শিক্ষার্থীপ্রতি যে বরাদ্দ আর মূলধারার সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীপ্রতি যে বরাদ্দ এর মধ্যেই বৈষম্য রয়েছে। আমরা এই বৈষম্য দূর করার জন্য চাই যে সরকার শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে। না হলে যেটি হবে, যারা নিজেদের অর্থে সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ করে দিতে পারবে, তারা আরো বেশি সুযোগ পাবে। বাকিরা সুযোগবঞ্চিতই থেকে যাবে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান

অনুলিখন : শরীফুল আলম সুমন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা