kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

ডেঙ্গু রোগে বেশি মৃত্যু প্রাইভেট হাসপাতালে

তৌফিক মারুফ    

১৭ জুন, ২০১৯ ০৮:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডেঙ্গু রোগে বেশি মৃত্যু প্রাইভেট হাসপাতালে

গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ৯ হাজার ২২৮ জন। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ মাসে কেউ মারা না গেলেও পরের ছয় মাসে মারা যায় ২৪ জন। এবার জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৪৮৬ জন। এর মধ্যে শুধু চলতি মাসের ১৩ দিনেই আক্রান্ত হয় ২২৩ জন। আর গত এপ্রিলে মৃত্যু ঘটে দুজনের। ঢাকার দুটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দুই রোগীর মৃত্যু হয়। গত বছর মৃত ২৪ জনের মধ্যে চারজন ছাড়া বাকি সবার মৃত্যু হয় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। কিছুদিন আগে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এক ধরনের তদন্তও করা হয়েছে। তাতেও খুব কাজ দিচ্ছে বলে মনে করেন না কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রে ওই সব বেসরকারি হাসপাতালের কিছু না কিছু উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এবার সেদিকে কঠোরভাবে নজর রাখা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, গত বছর জুনের আগে ডেঙ্গুতে দেশে কারো মৃত্যু না হলেও এবার এপ্রিলে এক দিনেই (২৯ তারিখ) দুজনের মৃত্যু হয় পুরান ঢাকার দুটি নামি বেসরকারি হাসপাতালে। মারা যাওয়া একজনের বাসা মিরপুরে, আরেকজনের গেণ্ডারিয়ায়। গত বছরের চেয়ে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরুতেই বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সুষ্ঠু চিকিৎসার ব্যাপারে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশনাসহ চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত বছরও এমন করা হয়েছিল। গত বছরও আমরা সব প্রাইভেট হাসপাতালেও গাইডলাইন পাঠিয়েছিলাম। জটিল রোগীর ব্যবস্থাপনা যেন ডেঙ্গু ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুযায়ী হয় সে ব্যাপারে আইসিইউ প্রধানদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করা হয়। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানের এ পর্যন্ত এক হাজার ২০০ ডাক্তার ও নার্সকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণের কিট বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু কেন যে প্রাইভেট হাসপাতালে বেশি ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয় সেটা আমরাও বুঝতে পারছি না।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘গত বছর ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতালে বেশি মারা যাওয়ার কারণ খুঁজতে কিছুদিন আগে এক দফা তদন্ত করা হয়েছিল। তখন আমরা কিছু হাসপাতালে গিয়ে জানতে চাইলাম তারা কিভাবে চিকিৎসা দিচ্ছে। তখন সবাই বলেছে, ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণ করার কথা। কিন্তু কোনো কোনো হাসপাতাল তাৎক্ষণিকভাবে ওই গাইডলাইন আমাদের দেখাতেই পারেনি। আবার আইসিইউর দায়িত্বে থাকা কেউ কেউ বলেছেন, রোগী এমন খারাপ অবস্থায় আমাদের এখানে এসেছিল যে তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাদের বাঁচানো যায়নি। এসব মিলিয়ে এবার আমরা গাইডলাইন ফলো করার বিষয়ে কঠোরভাবে নজরদারি করার চেষ্টা করছি।’

বেসরকারি হাসপাতালে বেশি মৃত্যুর ব্যাপারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল জাগা খুবই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে গত বছরের মৃতদের প্রত্যেকের আলাদা করে অ্যানালিসিস করা জরুরি। তবে হয়তো এর কারণটা বেরিয়ে আসতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে সে অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ডেঙ্গুর গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটছে। তাই এটি নিয়ে গবেষণা চলমান রাখতে হবে আর নতুন বিষয়গুলো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের একইভাবে সময়ে সময়ে অবহিত করতে হবে। তা না হলেও পুরনো গত্বাঁধা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আটকে থাকলে তা রোগীর জন্য বিপদ বয়ে আনবে।

এদিকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিপাকে পড়ে একেকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আবার সিটি করপোরেশনেরও এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই হাসপাতালে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে উদ্যোগ নিতে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যে পদ্ধতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম পরিচালিত হয় সেই পদ্ধতি ব্যবহার করলে হাসপাতালসহ বাসাবাড়ির ভেতরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর ফল আসতে পারে বলেও মত দেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে উপদেষ্টা করে উচ্চ পর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি বিমানবন্দরেও মশা নিয়ন্ত্রণ করতে লার্ভিসাইড ও এডালটিসাইড ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা যায় কি না তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি।’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গঠিত ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটির প্রথম সভা গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনার সভাপতিত্বে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কমিটির উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ডিপিএম (ডেঙ্গু) ডা. আক্তারুজ্জামান  কালের কণ্ঠকে জানান, ওই সভায় ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান, ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরো ব্যাপক জনসচেতনতা, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা মনিটরিং, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের নিয়ে এলাকায় এলাকায় বিশেষ মশা নিয়ন্ত্রণ ও মশার উৎস ধ্বংস করার অভিযান চালনা, মশা নিয়ন্ত্রণে যুগোপযোগী একটি জাতীয় গাইড লাইন প্রণয়ন করাসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে হাসপাতালে মশা নিয়ন্ত্রণে করণীয় ঠিক করতে সারা দেশের হাসপাতাল পরিচালকদের নিয়ে একটি বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়রের সভাপতিত্বে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদদের উপস্থিতিতে একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা হয়। এ ছাড়া চলতি বছর ডেঙ্গু ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স জোরদার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা নগরে অনেক নতুন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশার জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গত মার্চে চালানো জরিপে ডিএনসিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বেশ কিছু এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপে ব্যবহৃত সূচকের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। ওই সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নির্মাণাধীন বাসাবাড়ির ছাদে জমানো পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিক ড্রাম, বালতি, পানির চৌবাচ্চা, ফুলের টবে এডিস মশার বংশ বিস্তার বেশি দেখা যায়। ওই ফলের ভিত্তিতে এডিস মশার ঘনত্ব বেশি, এ রকম এলাকা সম্পর্কে দুই সিটি করপোরেশনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

সূত্র মতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১০টি জোনের প্রতিটিতে একটি করে মোট ১০টি অবহিতকরণ সভা করা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালকদের ন্যাশনাল ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা ও নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসায় অধিকতর সতর্কতা জরুরি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা