kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

সুন্দরবন নিয়ে শর্ত পূরণে কাজই শুরু হয়নি

আরিফুর রহমান    

১৬ জুন, ২০১৯ ০৯:০৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুন্দরবন নিয়ে শর্ত পূরণে কাজই শুরু হয়নি

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, পড়লে সে প্রভাব কী ধরনের হবে-এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা করতে তিন বছর আগে সরকারকে শর্ত দিয়েছিল জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। আগামী ৩০ জুন আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে শুরু হতে যাওয়া ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম সভায় সমীক্ষার ফল জমা দিতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ সময়সীমা পার হওয়ার ২৭ দিন আগে জানা গেল, এই কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষার (এসইএ) কাজই শুরু হয়নি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছরের মধ্যেই শুরু হবে সমীক্ষার কাজ। সমীক্ষার কাজ শেষ করতে ২০২০ সাল পুরোটা লেগে যাবে। কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সময়ে সময়ে ইউনেসকোকে জানানো হচ্ছে বলেও জানান কর্মকর্তারা।

এদিকে বিশ্ব ঐহিত্যের স্থান সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে প্রকৃতি রক্ষার বৈশ্বিক সংগঠন আইইউসিএন এবং ইউনেসকোর বিশ্ব ঐহিত্য কেন্দ্র। দুটি সংস্থা যৌথভাবে জানিয়েছে, সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করে তা সরিয়ে নেওয়া এবং সুন্দরবনের আশপাশে নতুন শিল্প-কারখানা নির্মাণের অনুমতি না দেওয়ার আহ্বান ছিল ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের। কিন্তু সেটি মানা হচ্ছে না। বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র সুন্দরবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পর্যালোচনা না করে এই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তারা বলেছে, সুন্দরবনের চারপাশে ১৫০টির বেশি শিল্প-কারখানা চালু আছে। এসব শিল্প-কারখানার কারণে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। আজারবাইজানের বাকুতে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সভায় দুই সংস্থার সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণার সুপারিশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ২০১৬ সালে আইইউসিএন-ইউনেসকোর যৌথ মিশনের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্যারাবন ও বাঘের অভয়ারণ্য সুন্দরবন ঘেঁষে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করে তা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি। কিন্তু সে আহ্বান না শুনে সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। এ কারণে সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে আইইউসিএন ও ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র।

অন্যদিকে এসইএ শেষ করার আগ পর্যন্ত সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন করে কোনো ধরনের শিল্প-কারখানা নির্মাণ কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অনুমোদন না দিতে ইউনেসকোর যে শর্ত রয়েছে, সেটি পালন করতে বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। কারণ দেশের অনেক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সুন্দরবনের পাশে আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে ছাড়পত্র নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে আবেদন করেছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। সুন্দরবনের চারপাশে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন না দিতে আদালতেরও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। বড় বড় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের প্রকল্পে ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য চাপ দিলেও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আদালতের নির্দেশনা ও ইউনেসকোর শর্তের কথা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা সুন্দরবনের চারপাশে শিল্পকারখানা নির্মাণ থামাতে পারছে না।

বন বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর পরিবেশের কৌশলগত প্রভাব সমীক্ষা তথা এসইএ পরিচালনা করার মতো কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করতে যে ধরনের জনবল ও সক্ষমতা দরকার তা বন বিভাগের নেই। এ কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। ইতিমধ্যে পাঁচটি দেশি-বিদেশি সংস্থা আগ্রহপত্র (রিকয়েস্ট ফর প্রপোজাল-আরএফপি) জমা দিয়েছে। এখন চলছে প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ একটি সংস্থার সঙ্গে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপ-বন সংরক্ষক জহির ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব বিচার বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে আগামী দুই মাসের মধ্যে যোগ্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তি সই হবে। সমীক্ষার কাজটি করতে দেড় বছর সময় দেওয়া হবে। সে হিসাবে ২০২০ সাল পুরোটা লেগে যাবে। ৩০ জুন ইউনেসকোর ৪৩তম সভায় প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে জহির ইকবাল বলেন, ‘আমরা ইউনেসকোকে সমীক্ষার বিষয়ে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দিচ্ছি।’

বন বিভাগ সূত্র জানায়, এসইএ পরিচালনায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে বাংলাদেশি সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস), ভারতের ইআরএম ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড, বেলজিয়ামের অ্যাগ্রের এসএএনভি, কানাডার ইঞ্জিনিয়ার কনসালটেন্ট লিমিটেড ও থাইল্যান্ডের ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট কম্পানি লিমিটেড। সংস্থাগুলোর অতীত কাজের গুণগত মান ও আর্থিক প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে কাজ দেওয়া হবে। সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হবে কি না তা নির্ভর করবে এর প্রতিবেদনের ওপর।

পরিবেশ, বন  ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এসইএ পরিচালনা মন্ত্রণালয়ের দুই সংস্থা বন বিভাগ না পরিবেশ অধিদপ্তর করবে, তা নির্ধারণ করতেই এক বছর সময় নষ্ট করা হয়েছে। বন বিভাগের দাবি ছিল, এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে তাদের জনবল ও সক্ষমতা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি ছিল, সুন্দরবনের অভিভাবক হলো বন বিভাগ। এই বিশাল সুন্দরবন অঞ্চল সম্পর্কে একমাত্র বন বিভাগেরই অভিজ্ঞতা আছে। তাই তাদেরই সমীক্ষার দায়িত্ব নেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সমীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে বন বিভাগ। কাজটি করতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে।

সমীক্ষার মধ্যে কী কী থাকবে-এ বিষয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো সুন্দরবনের চারপাশে কী পরিমাণ শিল্পাঞ্চল আছে, কেমন শিল্পাঞ্চল থাকতে পারে, তার একটি মূল্যায়ন থাকবে। সুন্দরবনের ভেতরে এখন যেভাবে লঞ্চ ও জাহাজ যাতায়াত হচ্ছে, তাতে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ওপর আসলে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, পড়লে সেটা কিভাবে, সেসব বিষয়েও সমীক্ষা করা হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি। এ কমিটি তাদের ৩৯তম অধিবেশনে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে বরাবরই আপত্তি জানিয়ে আসছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সুন্দরবনের ওপর একটি সমীক্ষা করার কথা বলে আসছে ইউনেসকো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা