kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

পাকা আমের ভেতর কচি আঁটি!

♦ বিক্রি চলছে কেমিক্যাল মেশানো অপরিপক্ব হিমসাগর ও ল্যাংড়া ♦ ৬ আড়তদারকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা ♦ ২০০ মণ কেমিক্যাল মেশানো আম ধ্বংস

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৫ মে, ২০১৯ ১১:৪৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাকা আমের ভেতর কচি আঁটি!

মিরপুরের দিয়াবাড়ী রোডে উত্তর বিশিল এলাকার ফলপট্টির কাছাকাছি যেতেই নাকে আসছিল আম, কাঁঠালের লোভনীয় ঘ্রাণ। কিন্তু সেখানে গিয়ে ফলের আড়তগুলো ঘুরে দেখা গেল, অধিকাংশ আমই কেমিক্যাল মেশানো এবং অপরিপক্ক। কিছু আম পচে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছিল। আর পরীক্ষার জন্য কাটা কাঁচা হিমসাগর, গোপালভোগ, লক্ষণভোগ আমের ভেতর দেখা গেল কচি আঁটি। ফলগুলো অপরিপক্ক। কিছু কিছু আমের ভেতরে পোকাও দেখা যায়। গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মিরপুর দিয়াবাড়ীর একাধিক ফলের আড়তে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

মিরপুর কৃষি কর্মকর্তার সহায়তায় অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাব-৪-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজাম উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজশাহীর হিমসাগর এখন বাজারে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু আড়তদাররা অসাধু ব্যাপারিদের সঙ্গে হাত করে কেমিক্যাল মেশানো অপরিপক্ব হিমসাগর আম বাজারে বিক্রির পাঁয়তারা করছে। দিয়াবাড়ীর এই আমের বাজারে আটটি আড়তে হিমসাগর, ল্যাংড়া ও অপরিপক্ব গুটি আম পাওয়া গেছে। অনেক পচা আমও পেয়েছি আমরা। এর মধ্যে হিমসাগর ও ল্যাংড়া রাখার কারণে ছয় আড়তদারকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি একই কাজ করে তবে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

অভিযানে অংশ নেওয়া মিরপুর মেট্রোপলিটন কৃষি অফিসার নূরজাহান বলেন, ‘আমরা বেশ ককেয়টি আড়তে গিয়ে যা দেখলাম তাতে বোঝা যাচ্ছে বিপুল অপরিপক্ব আম বাজারে চলে এসেছে। এগুলো কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বিক্রি করছে বিক্রেতারা। যা সবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কয়েকজন মালিক কেমিক্যাল দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে তারা বলছে ব্যাপারিরা কেমিক্যাল মেশাচ্ছে।’

সরেজমিনে সকাল ১১টার দিকে মিরপুর-১-এর দিয়াবাড়ী রোডের উত্তর বিশিল শাহাবুদ্দিন ট্রেডার্সে গিয়ে রাজশাহীর প্রায় ৪০ মণ হিমসাগর আম পাওয়া যায়। সেগুলো ছিল কেমিক্যাল মেশানো কাঁচা আম। র‌্যাবের হঠাৎ অভিযানে খানিকটা বোকা বনে যাওয়া শাহাবুদ্দিন ট্রেডার্সের মালিক শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমি জানি না এই আমগুলো কোত্থেকে আসছে। আমি শুধু লোকজন দিয়ে বিক্রির কাজটা করি। বাকি সব কাজ করে ম্যানেজার আর হেল্পাররা।’

মালিকের এমন দায়িত্বহীন বক্তব্যের সূত্রে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমি চাকরি করি। কি কি মাল আড়তে ঢোকানো হবে সেটা আমি কি করে বলব? মালিক না চাইলে কিছুই হয় না।’

এরপর অন্য আড়ত ভাই ভাই ট্রেডার্সে গেলে প্রায় ৩৫ মণের মতো অপরিপক্ব গোপালভোগ আম পাওয়া যায়। যেগুলোর অধিকাংশেরই এখনো আঁটি হয়নি। কিন্তু তার পরও এসব ফলের বাজারজাত চলছে হরদম। বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত আসছেন জেনে এই আড়তের মালিক আগেই কেটে পড়েন। পাশের দেওয়ান ট্রেডার্সে গেলে প্রায় ৬০ মণ কাঁচা, পাকা ও গুটি আম পাওয়া যায়। এই অপরিপক্ব আম কেন বিক্রি করছেন—জানতে চাইলে মালিকপক্ষের একজন বলেন, ‘ভাই আমরা তো বৈধ ভেবেই বিক্রির জন্য আনছিলাম। তবে এগুলো যে এখনো এত ছোট সেটা তো জানতাম না।’

এরপর আকাশ বাণিজ্য ভাণ্ডারে গিয়ে প্রায় ১০ মণ গোপালভোগ আম পাওয়া যায়। প্রায় একই অবস্থা মিরপুর শাহ আলী ফার্মেও। এই আড়তে প্রায় ২০ মণ রাজশাহীর হিমসাগর আম পাওয়া যায়। কিন্তু আড়তদার দাবি করেন, এগুলো রাজশাহীর নয়, সাতক্ষীরা থেকে আনা। মেসার্স জামাল এন্টারপ্রাইজে পাওয়া যায় প্রায় ২৫ মণ কেমিক্যাল মেশানো অপরিপক্ব লক্ষণভোগ আম। যার সবই পচা আর কাঁচা।  রাজু ট্রেডার্সে গিয়ে প্রায় ১০ মণ গুটি আম পাওয়া যায়। সব শেষে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত যান সরদার ট্রেডার্সে, যেখানে প্রায় ৩০ মণ গোপালভোগ আর হিমসাগর আম আড়তের পেছনে লুকিয়ে রাখা ছিল যা খুঁজে বের করেন র‌্যাব সদস্যরা।

এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশে পরীক্ষার জন্য আম কাটলে দেখা যায় অধিকাংশেরই ভেতরে আঁটি হয়নি। কোনো কোনোটির ভেতরে পাওয়া যায় পোকা। আটটি আড়তে অভিযান চালিয়ে রাজশাহীর অপরিপক্ব হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম রাখার কারণে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আর দুটিতে শুধু গুটি আম থাকায় সতর্ক করে দেয় র‌্যাব। এ বিষয়ে কথা বললে মিরপুর শাহ আলী ব্যবসায়ী কো-অপারেটিভের সাধারণ সম্পাদক আকরাম আলী সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, লোভের কারণে আজ ব্যবসায়ীদের এই দুর্দশা। এতবার নিষেধ করা সত্ত্বেও এসব ভেজাল আম বাজারে নিয়ে আসছে ব্যবসায়ীরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা