kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

'ঢাকা ইনিশিয়েটিভ'র লেখক-পাঠক সংলাপ, কথায় কথায় অনুরণিত হলো বাতিঘর

আবুল মাল আবদুল মুহিত ও মোস্তফা কামাল তুলে ধরলেন ইতিহাস অনুসন্ধানের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ মে, ২০১৯ ১৭:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'ঢাকা ইনিশিয়েটিভ'র লেখক-পাঠক সংলাপ, কথায় কথায় অনুরণিত হলো বাতিঘর

ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যচর্চা নিয়ে প্রাণময় কথায় অনুরণিত হলো ঢাকার বাতিঘর মিলনায়তন। আজ শুক্রবার সকালে নির্ধারিত সময়ে লেখক-পাঠকেরা উপস্থিত হলেন। তারা শুনলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ইতিহাস অনুসন্ধান ও লেখালেখির কথা। অগ্নিপুরুষসহ একাধিক ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসের লেখক, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালও বললেন বঙ্গবন্ধু ও উত্তাল সময়ের রূপায়ন তিনি কীভাবে করেছেন তাঁর রচিত গ্রন্থে। 

ঢাকা ইনিশিয়েটিভের উদ্যোগে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যচর্চা বিষয়ে লেখক-পাঠক সংলাপে এভাবেই উঠে আসে দেশকে এগিয়ে নিতে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্য রচনার গুরুত্ব। তরুণ পাঠকেরাও তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।  

সকাল সোয়া ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরু হতে না হতেই উপস্থিত হন প্রধান অতিথি আবুল মাল আবদুল মুহিত। 

তার আগেই বিশেষ অতিথি মোস্তফা কামালের কাছেও পাঠকরা প্রশ্ন রাখতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মুহিত বলেন, আমার লেখা প্রবন্ধ ৩৫টি। বহু চেষ্টা করেও জীবনে একটা কবিতা লিখতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা। প্রবন্ধ মানেই গবেষণা। সব বিষয়ে সব সময় তথ্যও পাওয়া যায় না। ৮৫ বছর বয়স পর্যন্ত একই স্পিডে ভয়ংকর ব্যস্ত জীবন পার করেছি। ব্যস্ততার মধ্যেও যে ৩৫টি প্রবন্ধ লিখেছি, তা কম নয়। কারণ, আমার প্রতিটি লেখাই অনেক কষ্ট করে লেখা, অনেক গবেষণার ফসল।

তিনি বলেন, আমি লেখালেখি শুরু করি যখন আমার বয়স ১০ বছর। ১৯৪৪ সালে একটি রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমার লেখালেখি শুরু। পরবর্তীতে, ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু করি ১৯৪৬-৪৭ সালে। সিলেটে ১৯৩০ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত প্রথমে সাপ্তাহিক, পরে দৈনিক যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক আমাকে পত্রিকাটির অর্ধেক দিয়ে দেন লেখালেখির জন্য। আমি তখন পত্রিকাটির কিশোর মজলিশ নামের পাতায় লিখতাম। অর্ধেক পত্রিকায় লেখার জন্য কার কাছে যাবো, কী করবো? তার থেকে আমি নিজেই বিভিন্ন নামে নানা ধরনের গল্প লিখতাম, শুধু কবিতা ছাড়া। 

মুহিত বলেন, ১৯৫১ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি। তার আগ পর্যন্ত জীবনের ১৭টি বছর সিলেটেই কাটিয়েছি। ঢাকায় এসে পায়ে হেঁটে অনেক ঘুরেছি। মুড়ির টিন বাসে ঘুরেছি। তখন কয়েক আনা বাস ভাড়া ছিল। ১৯৫২ সালে সংবাদ পত্রিকায় ‘ইরানের তেল’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখি। ইংরেজি অবজার্ভার পত্রিকাতেও লিখতাম।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা অনেক ভালো ছিল। দ্বিতীয়বর্ষে থাকতেই ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। মুসলিম হলের নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক হই। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল। সে সময় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার্ষিক ম্যাগাজিন বের করতাম। তাতে শিক্ষকরাও লেখা দিতেন।

নিজের অভিনয় জীবনের কথা কথা উল্লেখ করে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে একটা ভূমিকায় অভিনয়ে সিলেকশনের জন্য যাই। স্কুলে থাকতে নাটক করেছিলাম। তবে এখানে নাটকের সিলেকশনে ফেল করি। সেই যে ফেল করেছি, আর কোনোদিন অভিনয়ের ধারে-কাছে যাইনি। কিন্তু সেই থেকেই নাটকের অর্গানাইজার হয়ে যাই।

বিশেষ অতিথি বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক এবং দৈনিক কালের কণ্ঠ এর নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, আমি নিয়মিত লেখালেখি করি ১৯৯১ সাল থেকে। প্রতিদিনই লেখি। সবসময় চেয়েছি, কাজ করলে বড় কাজই করবো। আমার অধিকাংশ বই ইতিহাসভিত্তিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প-উপন্যাস। ইতিহাসের বই থেকে ইতিহাস জানা যায়, তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটা কাঠখোট্টা বিষয় মনে হতে পারে। আমি মনে করি, ইতিহাস যদি স্ট্রাকচার হয়, আর তাতে যদি রক্ত-মাংস, জীবন দেওয়া যায়, তাহলে এটি কথা বলতে পারে। ইতিহাসবিদ ইতিহাস রচনা করেন, কিন্তু একজন সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক ইতিহাসকে প্রাণ দেন। তখন ইতিহাস কথা বলে, হাঁটতে শেখে। ইতিহাস তখন সত্যের জায়গায় চলে যায়। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি তরুণেরা যেভাবে গল্প-উপন্যাস পড়ে, সেভাবে ইতিহাসের বই পড়ে না।  তারা ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস-গল্প পড়তে পারে। একটা সময় ছিল, টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যেত না। ইতিহাস সঠিক ধারায় না হাঁটলে, ভুল ইতিহাস একটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। সে কারণেই আমরা দেখি, হুমায়ূন আহমেদ তার নাটকে তোতাপাখির মুখ দিয়ে ‘তুই রাজাকার’ বলিয়েছেন। একজন লেখক যদি ভবিষ্যৎ না দেখতে পারেন, তাহলে আমি মনে করি, তিনি উঁচু পর্যায়ের কোনো কাজ করতে পারবেন না।

ঢাকা ইনিশিয়েটিভের সমন্বয়ক পার্থ সারথি দাস বলেন, সামনের পথে এগিয়ে যেতে অতীতের কাছ থেকে উৎসাহ দরকার। দীর্ঘ আপসহীন লড়াইয়ের ইতিহাস আছে বাঙালির। দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন অসংখ্য বীর সন্তান। হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু আমরা আমাদের ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্য রচনায় ফেলে আসা আন্দোলন, বীর যোদ্ধা কিংবা দেশনায়ক কিংবা উন্মাতাল দিনগুলো পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতে কতটা সফল হয়েছি- এমন প্রশ্ন সামনে রেখেই ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যচর্চা বিষয়ে লেখক-পাঠক সংলাপ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ভবিয্যতে এ বিষয়ে আরো আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকা-ইনিশিয়েটিভের। তিনি আগত লেখক-পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সংলাপে আরো অংশ নেন সাহিত্যিক ও অধ্যাপক হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ঔপন্যাসিক ইসমাইল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মামুন উর রশিদ, কবি রোকন জহুর, লেখক আরিফ খন্দকার। তরুণ পাঠকরা হিসেবেও অনেকে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংবাদিক আবদুল্লাহ নুহ। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এস এ টিভির সহকারি বার্তা সম্পাদক মুস্তফা মনওয়ার সুজন, দীপক ভৌমিক, প্রকাশক মিঠু কবীর প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। এসময় আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাদের বই উপহার দেওয়া হয়। এছাড়া সব পাঠকদেরও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয় আয়োজক সংগঠনের পক্ষ থেকে। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে অয়ন প্রকাশনী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা