kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সম্পর্ক নিয়ে শঙ্কা নেই, ভারতের নতুন সরকারের নীতির দিকে দৃষ্টি ঢাকার

মেহেদী হাসান    

২৩ মে, ২০১৯ ০৮:৪০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্পর্ক নিয়ে শঙ্কা নেই, ভারতের নতুন সরকারের নীতির দিকে দৃষ্টি ঢাকার

ভারতে লোকসভা নির্বাচনের আজকের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, গত এক দশকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে সুসম্পর্ক রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশেই বড় পরিসরে মতৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নয়াদিল্লির এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারতে নতুন সরকার গঠন হলে বা সরকার বদলালেও পররাষ্ট্রনীতি বা সম্পর্ক বদলে যায় না। বরং দেখা গেছে, আগের সরকার তার নেতৃত্বে বৈদেশিক সম্পর্ক যে পর্যায়ে রেখে যায়, পরবর্তী সরকার সেখান থেকেই সেই ধারাবাহিকতায় কাজ শুরু করে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তার পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকারমূলক বিষয়, বিশেষ করে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে—এমন ইস্যুগুলোর দিকে ঢাকার নিবিড় দৃষ্টি থাকবে। ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারেও বাংলাদেশের ব্যাপারে বেশ কিছু বিষয় এসেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, বিশেষ করে আসাম রাজ্যে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপারে ভারতের নতুন সরকার কী উদ্যোগ নেয়, সেদিকে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের দৃষ্টি থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ও রাহুল গান্ধীর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের (আইএনসি) নির্বাচনী ইশতেহার ঘেঁটে দেখা যায়, বড় ওই দুটি দলই অবৈধ অভিবাসন সমস্যাকে তাদের ইশতেহারে রেখেছে। বিজেপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসনের কারণে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও কর্মসংস্থানে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এসব এলাকায় দ্রুত ‘জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস, সংক্ষেপে এনআরসি)’ সম্পন্ন করবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আসামের বাইরে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও পর্যায়ক্রমে এনআরসির মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অনুপ্রবেশ রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া অব্যাহত রাখার কথা বলেছে বিজেপি। এ ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা আরো জোরদার এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আসামের ধুবরি সীমান্তে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে বিজেপির ইশতেহারে।

অন্যদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, “‘জয় জোয়ান, জয় কিষান’ স্লোগানে অনুপ্রাণিত কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারই ভারতকে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানকে দৃঢ়ভাবে পরাজিত ও বাংলাদেশকে মুক্ত করেছি।”

রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস তার ইশতেহারে বলেছে, চূড়ান্ত এনআরসিতে যাতে কোনো ভারতীয় নাগরিক বাদ না পড়ে, তা তারা নিশ্চিত করবে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘ভারতে অনুপ্রবেশ ইস্যু সমাধানে আমরা প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করব।’

বিজেপি তার ইশতেহারে মোদি সরকারের ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতি অব্যাহত রাখার এবং আঞ্চলিক জোট বিমসটেককে আরো জোরদারের কথা বলেছে। সমন্বিত চেকপোস্ট (ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট—আইসিপি) নির্মাণ কাজ শেষ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য বাড়ানোর কথাও রয়েছে বিজেপির ইশতেহারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের নিপীড়িত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারতের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য আইন প্রণয়নের কথাও বলেছে বিজেপি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের আসামে এনআরসি নিয়ে বিতর্ককে ওই দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও অবৈধ অভিবাসন ইস্যুটি ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভারতের সরকারগুলোর বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারমূলক কিছু বিষয় থাকে। যেমন—ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতি। ২০১৭ সালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফরের সময় বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারতের কাছে তার প্রতিবেশীরাই প্রথম অগ্রাধিকার। সেই প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রথমেই আছে বাংলাদেশ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, গত পাঁচ বছরের বেশি সময় দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাঁর প্রথম একক বিদেশ সফরে বাংলাদেশে এসে তাঁর দেশের কাছে এ দেশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়েও সম্পর্ক রাষ্ট্রাচারের আনুষ্ঠানিকতাকেও ছাড়িয়ে যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ একে ‘কুটুম্ব’ (আত্মীয়তা) হিসেবে অভিহিত করেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিকবার বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ বানিয়েছেন। আর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছেন।’

প্রায় ছয় দশকের পুরনো স্থলসীমান্ত সমস্যা মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকারের সময় সমাধানের কাছাকাছি এসেও রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি। মোদির এনডিএ সরকার ক্ষমতায় এসে সর্বসম্মতিক্রমে সেই বিল বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে ভারতের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়। এর আরেকটি দৃশ্যমান উদাহরণ হলো প্রস্তাবিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধিতার কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এখনো সেই চুক্তি সই করতে পারেনি।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গণতান্ত্রিক ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যে-ই আসুক না কেন, তাকেই স্বাগত জানাবে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেখানে সরকার বদল হলেও এ সম্পর্ক বদলাবে না। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়া এ সম্পর্ক সব সময় টিকে থাকবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা