kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা আটকে দিলেন হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ মে, ২০১৯ ০৮:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা আটকে দিলেন হাইকোর্ট

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারের কার্যকারিতার ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ২৪ জুন পর্যন্ত এ স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়েছে। ফলে এ সময়ে ওই সার্কুলারের ভিত্তিতে কোনো ধরনের ঋণ বিতরণ বা মওকুফের সুযোগ থাকল না।

ওই সার্কুলার স্থগিত চেয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা একটি সম্পূরক আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ আদেশ দেন।

আবেদনকারীপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মো. মনিরুজ্জামান।

গত ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ‘ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট-সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ জারি করে ব্যাংকগুলোয় পাঠানো হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা ওই সার্কুলার অনুযায়ী, মাত্র ২ শতাংশ এককালীন নগদ জমা (ডাউন পেমেন্ট) দিয়ে ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃ তফসিল বা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধের বিশেষ সুবিধা পাবেন ঋণখেলাপিরা। এ ক্ষেত্রে তাঁদের ঋণের সুদ হার হবে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ, যদিও তা কোনোভাবেই ৯ শতাংশের বেশি হবে না। একই সঙ্গে ওই দিনই আরেকটি সার্কুলারে যাঁরা নিয়মিত ঋণ শোধ করেন, তাঁদের সুদে ১০ শতাংশ রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কেউ ঋণখেলাপি হলে তা পুনঃ তফসিল সুবিধা পেতে ১০ শতাংশ অর্থ এককালীন শোধ করার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের বিষয়ে সার্কুলার জারির পরই তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

ওই দিন একই আদালত এক আদেশে ২৪ জুনের মধ্যে ঋণখেলাপিদের তালিকা দাখিল করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে সার্কুলারটি জারি করে। সেদিন সার্কুলারটি জারির বিষয়টি জানিয়ে আবেদনকারী পক্ষ স্থগিতাদেশ চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সার্কুলার জারি হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ওই দিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।

গতকাল স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়ে আদালত ওই সার্কুলারকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘দুষ্টের পালন, শিষ্টের দমন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, যারা ব্যাংক লুট করে নিয়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদেরই দুধ-কলা দিয়ে পুষছে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে পাচার করা হচ্ছে। অথচ এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেই। আবার যদি ঋণখেলাপিরা সুযোগ পায় তারা আরো এক লাখ কোটি টাকা নিয়ে যাবে। আদালত প্রশ্ন তুলে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কিভাবে ঋণখেলাপিদের পক্ষ নেয়?

আদালত বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিংব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব নয়। সুদখোরদের ব্যাংক হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটাই আমাদের দেখার বিষয়।’ আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যাংকগুলোকে ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য বলেছেন। কিন্তু তারা সে নির্দেশনা মানছে না। অথচ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ঋণখেলাপিদের ৯ শতাংশ সুদে বাকি ঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দিচ্ছে। আর যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তাদের কাছ থেকে ১৪-১৫ শতাংশ হারে সুদ নেওয়া হচ্ছে। এই বৈষম্য কেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সার্কুলারকে হাইকোর্টের সঙ্গে প্রতারণা বলে উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ অকার্যকর করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই সার্কুলার জারি করেছে।

তবে বাংলাদেশ বাংকের আইনজীবী বলেছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্যই কৌশল হিসেবে এই সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

গতকাল আদেশের পর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার জারি করার ফলে তারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপির তালিকা থেকে মুক্তি পাবে। সিআইবিতে (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) তাদের নাম থাকবে না। এরপর তারা আবার নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। এ কারণে এই সার্কুলার স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছিলেন তিনি।

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আদালত স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছেন। এই আদেশের পর ওই সার্কুলারের সুবিধা কেউ নিতে পারবে না।’

এইচআরপিবির করা এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ঋণখেলাপির তালিকা দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রুল জারি করেন। রুলে আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, সিটি ব্যাংকের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মামুন রশিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে কমিশন গঠনে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদসচিব, প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দুই সচিব, আইনসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এই আদেশের পরও ঋণখেলাপির তালিকা দাখিল না করায় গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ১৫ দিনের মধ্যে তালিকা দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ অবস্থায় গত ১৬ মে ঈদের ছুটি শেষে আদালত খোলার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা