kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

বয়সের ফ্রেম দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণ করা যাবে না : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মে, ২০১৯ ১৮:৩৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বয়সের ফ্রেম দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণ করা যাবে না : হাইকোর্ট

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে সর্বনিম্ন বয়স ১৩ বছর ও সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করে সরকারের জারি করা বিভিন্ন সময়ের গেজেট ও পরিপত্র অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ সংক্রান্ত ২০১৮ সালের ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন’ এর ২(১১) ধারার অংশ বিশেষ অসাংবিধানিক ও বাতিল করা হয়েছে। 

বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ রবিবার এ রায় দেন। ওইসব গেজেট ও পরিপত্রের মাধ্যমে যেসব মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ও সুযোগ-সুবধা বন্ধ করা হয়েছে তাদের সকল সুবিধা এই রায়ের কপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে চালু করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সকল বকেয়া পরিশোধ করতেও বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ভূতাত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক মাহমুদ হাসানসহ দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার করা পৃথক ১৫টি রিট আবেদনে জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আজ এ রায় দেন আদালত। রিট আবেদনকারীপক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার ওমর সাদাত, ব্যারিস্টার এবিএম আলতাফ হোসেন, ড. ইউনুছ আলী আকন্দ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান।

রায়ে মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স ১৩ বছর নির্ধারণ করে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর জারি করা গেজেট এবং সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি জারি করা গেজেট অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর জারি করা সার্কুলার অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

আদালত তার রায়ে বলেছেন, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশের (পিও-৯৪) ২(এইচ)(এ) দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটাই সঠিক। এটা শুধুমাত্র জাতীয় সংসদই পরিবর্তন করতে পারে। সরকারি কোনো গেজেট, পরিপত্র বা সার্কুলার দিয়ে এই সংজ্ঞা পরিবর্তন করা যাবে না। সুতরাং এইসব গেজেট ও পরিপত্র অসাংবিধানিক ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত। এইসব গেজেট ও পরিপত্র দিয়ে বয়স নির্ধারণও অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত। 

আদালত বলেছেন, বয়সের ফ্রেম দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। ঐতিহাসিক দলিল-প্রমানের ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে ১০ বছরের শহিদুল ইসলাম লালুকে বীর প্রতিক খেতাব দিয়েছেন সেখানে কিভাবে সরকার রিট আবেদনকারীদের অমুক্তিযোদ্ধা বলে তা বোধগম্য নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের এই বয়স নিয়ে গবেষনা হওয়া দরকার। 

আদালত বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০০২ অনুযায়ী জামুকাকে শুধুমাত্র কার সনদ জাল তা চিহ্নিত করে সঠিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নে সরকারের কাছে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা (জামুকা) মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে যা ক্ষমতা বহির্ভূত ও অবৈধ। আর এই সুপারিশের ভিত্তিতে যে সব পরিপত্র বা গেজেট জারি করা হয়েছে তাও অবৈধ।  

রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন-২০১৮ এর ২(১১) ধারায় মুক্তিযোদ্ধার ন্যুনতম বয়স নির্ধারণ করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে যার যা আছে তাই নিয়েই দেশের সকল নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। 
এরপর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরে বঙ্গবন্ধু টেলিগ্রামের মাধ্যমে যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন সেখানেও যার যা কিছু আছে তা নিয়েই হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন। উক্ত ভাষণ (৭ মার্চের) ও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে। যা আমাদের সংবিধানের ৫ম তফশিলে সন্নিবেশিত হয়েছে। যা সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদ দ্বারা সংরক্ষিত। সুতরাং এমন কোনো আইন করা যাবে না যা সংবিধান পরিপন্থী হয়।

রায়ে বলা হয়, যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তিযোদ্ধার বয়সের সীমারেখা দেওয়া হয়নি, বরং সকল বয়স, সকল ধর্মের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর সংবিধান সংশোধন না করে মুক্তিযোদ্ধার ন্যুনতম বয়স নির্ধারণ করতে পারে না সরকার বা অন্য কেউ। সুতরাং ২০১৮ সালের ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট আইন-২০১৮’ এর ২(১১) ধারায় বর্ণিত ‘উক্ত সময়ে যাহাদের বয়স সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে’-এই অংশটুকু সংবিধান পরিপন্থী। যা শুরু থেকেই বাতিল বলে গণ্য হবে। এই বয়স নির্ধারণ করে যার সম্মানি বন্ধ করা হয়েছে তা অবৈধ।

আদালত রায়ে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও সাত/আট বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। বাংলাদেশে তো শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বইও আছে। গত ৪৫ বছর ধরে তারা (রিটকারীরা) সকল সুবিধা পেয়ে আসছেন। হঠাৎ করে তারা জানলেন, তারা আর মুক্তিযোদ্ধা নন। আদালত বলেন, যে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর ভিত্তি করে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের যদি অস্বীকার করি তাহলে আমরা আর সামনে এগুতে পারবোনা। মনে রাখতে হবে যে, মূলত আবেগের তাড়না থেকেই মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে। দেশের প্রতি ভালোবাসার কারণে করেছে। আর এই ভালোবাসা বয়স দিয়ে কখনো বাধা যায় না।

বীর প্রতীক শহীদুল ইসলাম লালু’র উদাহরণ তুলে ধরে এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে লালুর ছবি দেখিয়ে ব্যারিষ্টার ওমর সাদাত তার শুনানিতে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১০ বছর। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন এবং বীর প্রতীক খেতাব দিয়েছিলেন। অথচ সরকারের এইসব গেজেট ও পরিপত্রের কারণে বীর প্রতীক তো ননই, তিনি আজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও বিবেচিত হবেন না। আদালত তার রায়ে এই অংশ তুলে ধরেন।

২০১৫ সালের ২ নভেম্বর জারি করা সার্কুলার, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখ মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স ১৩ বছর নির্ধারণ করে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর জারি করা গেজেট এবং ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর তারিখ সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি জারি করা গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এসব রিট আবেদন করা হয়। 

এসব রিট আবেদনে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট আইন-২০১৮’ এর ২(১১) ধারায় বর্ণিত ‘উক্ত সময়ে যাহাদের বয়স সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে’-এই অংশটুকু সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা চাওয়া হয়। এসব রিট আবদেনে আদালত রুল জারি করেন। এই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল রায় দিয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা