kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

যৌন হয়রানি প্রতিরোধ

নুসরাতরা মরছে, যৌন নির্যাতন আইনের খসড়ায় ধুলো জমছে

রেজাউল করিম   

১৮ মে, ২০১৯ ০৯:৪৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নুসরাতরা মরছে, যৌন নির্যাতন আইনের খসড়ায় ধুলো জমছে

অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর আগে ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি

যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগুনে জীবন দিতে হলো ফেনীর নুসরাত জাহান রাফিকে। কয়েক দিন আগে কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে এস সেবিকাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে টাঙ্গাইলে একইভাবে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন রূপা নামে সিরাজগঞ্জের এক তরুণী। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। আবার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের অনেক সদস্যও হত্যাসহ নানা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত এর মাত্রা যেন বেড়েই চলেছে, লাগাম টানা যাচ্ছে না কোনোভাবেই।

আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, একের পর এক এমন অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই দেশে। ফলে প্রতিকার চেয়ে সরাসরি কেউ আদালতের আশ্রয় নিতে পারে না। এ রকম অপরাধের জন্য কাউকে নির্দিষ্ট আইনে শাস্তিও দেওয়া যাচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকর নয়। এর ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

জানা যায়, ২০১০ সালের আগস্ট মাসে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে বাংলাদেশ আইন কমিশন। আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে তা আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে জমাও দেওয়া হয়। এরপর এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেউ। আইনের খসড়াটি প্রস্তুত করতে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও আইন কমিশন যৌথভাবে কাজ করে।

এ বিষয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ রকম আইন করা সময়ের দাবি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। তবে এসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ২০১০ সালে আইন কমিশন একটি ভালো প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইনের খসড়াও আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিল কমিশন। আইন মন্ত্রণালয় সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করে। এরপর বিষয়টি নিয়ে কেউ এগোয়নি। আমরা এ নিয়ে শিগগির আলোচনা করব। আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ রকম আইন প্রণয়ন সম্ভব হবে।’

আনিসুল হক বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনা রয়েছে যৌন হয়রানি রোধে। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকার অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করি, নতুন আইন প্রণীত হলে, এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ আরো সচেতন হবে এবং এই অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে। আইনটি হলে বিচারপ্রার্থী সরাসরি আদালতে গিয়ে এই অপরাধের প্রতিকার পাবে।’

আইন কমিশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. এম শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, যৌন হয়রানি বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের প্রণীত বিল ও আইনের আলোকে সে সময় খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। ২০১০ সালের প্রস্তাবিত আইনটির উদ্দেশ্য হলো, কর্মস্থলে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের হয়রানিমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা। দেশের প্রচলিত আইনে যৌন হয়রানিমূলক কিছু কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের অপরাধ দমনে কার্যকর ফল আসছে না। কেননা দণ্ডবিধির প্রচলিত শাস্তি অপেক্ষা কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত প্রশাসনিক শাস্তি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অধিক গ্রহণযোগ্য।

ড. শাহ আলম বলেন, খসড়া আইনে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ আইনে উল্লিখিত অন্যান্য প্রয়োজনীয় শব্দের সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। এ আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা অনুসারে অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী কী করণীয়, খসড়া আইনে তার বিধানের কথা বলা হয়েছে। খসড়া আইনে মিথ্যা মামলা বন্ধের জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণ হলে গুরুত্ব ও প্রকৃতি ভেদে লঘু-গুরু শাস্তি এবং ভিকটিমের জন্য জরিমানা আদায়ের বিধি সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ খসড়াটি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেই।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলেছে, যৌন হয়রানি বা সহিংসতার পেছনে যত কারণ আছে, যৌন হয়রানি বিষয়ে কোনো আইন না থাকা এর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার সংস্কৃতি, নারীর ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক ও সামাজিক বাধা এবং জটিল ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা